খোঁজ অভিযানে ‘হত্যাকারী’: জায়হানের বাবার পাশে বসে চা পান

চট্টগ্রামের পটিয়া পৌরসভায় পাঁচ বছর বয়সী নিষ্পাপ শিশু মোহাম্মদ জায়হান হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এক চাঞ্চল্যকর ও নৃশংস তথ্য উদঘাটিত হয়েছে। পারিবারিক জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে অন্য এক প্রতিপক্ষকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করা হয়। ঘটনার পর অপরাধ ঢাকতে অভিযুক্ত মূল পরিকল্পনাকারী নিহত শিশুর পরিবারের সাথে অনুসন্ধানে অংশ নেন এবং শিশুটির বাবার সাথে বসে চা পান করেন। পরবর্তীতে পুলিশি তদন্ত, জিজ্ঞাসাবাদ এবং একটি চিরকুটের হাতের লেখা বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঘটনার মূল রহস্য উন্মোচিত হয়।

নিখোঁজ ও মরদেহ উদ্ধার

গত মঙ্গলবার দুপুর থেকে চট্টগ্রামের পটিয়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ গোবিন্দারখীল পূর্ব পাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ শাহজাহান ও জোবাইদা বেগমের একমাত্র পুত্রসন্তান জায়হান (৫) নিখোঁজ হয়। এক বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে জায়হান ছিল ছোট। শিশুটির নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা বিভিন্ন স্থানে সন্ধান শুরু করেন। নিখোঁজের পর অপরাধীদের পক্ষ থেকে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে একটি চিরকুট পাঠানো হয়। পরিবারটি তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে অবহিত করে এবং থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নথিভুক্ত করে।

নিখোঁজের পর থেকে উদ্ধার অভিযান চলাকালীন সময় পর্যন্ত অভিযুক্ত প্রতিবেশী মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন অত্যন্ত স্বাভাবিক আচরণ প্রদর্শন করেন। তিনি নিহত জায়হানের স্বজনদের সাথে যুক্ত হয়ে বাড়ির পার্শ্ববর্তী পুকুর, ডোবা এবং বিভিন্ন স্থানে অনুসন্ধানকাজে সরাসরি অংশ নেন। একপর্যায়ে তিনি নিখোঁজ শিশুর পিতা মোহাম্মদ শাহজাহানের সাথে বসে চা-ও পান করেন। দীর্ঘ ১৫ বছরের প্রতিবেশী হওয়ায় সাইফুদ্দিনের এই আচরণে পরিবারের সদস্য বা স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে কোনো প্রকার সন্দেহের উদ্রেক হয়নি।

গত বুধবার দুপুরে পুলিশ তদন্তের অংশ হিসেবে চিরকুটের হাতের লেখার সাথে সাইফুদ্দিনের পরিবারের সদস্যদের লেখার মিল খুঁজে পায়। হস্তাক্ষর বিশদভাবে যাচাই করার পর পটিয়া থানা পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবে প্রতিবেশী মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন, তার স্ত্রী শানু আক্তার এবং তাদের ১৯ বছর বয়সী মেয়ে সাদিয়া সুলতানাকে আটক করে। থানায় এনে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে আটককৃত ব্যক্তিরা শিশু জায়হানকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যার কথা স্বীকার করেন। পরবর্তীতে তাদের স্বীকারোক্তি এবং দেখিয়ে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার গভীর রাতে অভিযুক্তদের বাড়ির পেছনের ময়লার স্তূপ থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় জায়হানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ ও মোটিভ

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাসুদ আলম এক সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার মূল মোটিভ বা কারণ স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানান, মোহাম্মদ সাইফুদ্দিনের সাথে তার নিজস্ব চাচাতো ভাইয়ের দীর্ঘদিন ধরে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ চলছিল। এই বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষকে একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে ফাঁসানোর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করেন সাইফুদ্দিন। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে তিনি নিষ্পাপ শিশু জায়হানকে অপহরণ ও হত্যা করেন, যেন এই দায় তার প্রতিপক্ষের ওপর চাপানো যায়। মুক্তিপণ দাবির চিরকুটটি মূলত ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার একটি কৌশল ছিল। সাইফুদ্দিনের মেয়ে সাদিয়া সুলতানার হাতের লেখার সাথে উক্ত চিরকুটের লেখার মিল পাওয়ায় পুলিশ দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।

হত্যাকাণ্ডের সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও তথ্য সারণি:

বিষয় বা পক্ষসংশ্লিষ্ট বিবরণ ও তথ্য
নিহত শিশুমোহাম্মদ জায়হান (বয়স: ৫ বছর), পিতা: মো. শাহজাহান, মাতা: জোবাইদা বেগম।
ঘটনাস্থলদক্ষিণ গোবিন্দারখীল পূর্ব পাড়া, ৮ নম্বর ওয়ার্ড, পটিয়া পৌরসভা, চট্টগ্রাম।
সময়ক্রমমঙ্গলবার দুপুরে নিখোঁজ; বুধবার গভীর রাতে বস্তাবন্দী মরদেহ উদ্ধার।
অভিযুক্ত ব্যক্তিগণমোহাম্মদ সাইফুদ্দিন (মূল পরিকল্পনাকারী), স্ত্রী শানু আক্তার এবং কন্যা সাদিয়া সুলতানা (১৯)।
হত্যাকাণ্ডের কারণচাচাতো ভাইয়ের সাথে জমি সংক্রান্ত বিরোধ; প্রতিপক্ষকে খুনের মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা।
তদন্তের মূল সূত্রমুক্তিপণ দাবির চিরকুটে সাদিয়া সুলতানার হাতের লেখার মিল এবং পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ।
আইনি প্রক্রিয়াআসামিদের আটক করা হয়েছে এবং পটিয়া থানায় একটি নিয়মিত হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়াধীন।

আইনি পদক্ষেপ ও স্থানীয় প্রতিক্রিয়া

পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল হক গণমাধ্যমকে জানান, প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদনে শিশু জায়হানের মাথায় ভারী বস্তুর বা হাতুড়ির আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, মাথায় গুরুতর আঘাতের ফলেই তার মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের বিশ্বস্ত প্রতিবেশীর দ্বারা সংঘটিত এমন নৃশংস অপরাধের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। আজ বৃহস্পতিবার সকালে পটিয়া ডাকবাংলা এবং থানা এলাকায় সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ ও বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী একত্রিত হয়ে একটি প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিল থেকে অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।

নিহত শিশুর মা জোবাইদা বেগম জানান, অপহরণের পর একপর্যায়ে তিনি দূর থেকে তার সন্তানের আর্তচিৎকার সদৃশ “ও মা” ডাক শুনতে পেয়েছিলেন। তবে তৎকালীন পরিস্থিতি এবং প্রতিবেশীদের বিভ্রান্তিকর আশ্বাসের কারণে তিনি তা তাৎক্ষণিকভাবে অনুধাবন করতে পারেননি। দীর্ঘদিনের পরিচিত প্রতিবেশীদের এই নৃশংসতায় পুরো পরিবারটি বর্তমানে শোকে স্তব্ধ। পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, আটককৃত আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে আদালতে সোপর্দ করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।