কুয়াকাটায় জেলিফিশ মৃত্যুর ব্যাপক উদ্বেগ

পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রতি বিপুল সংখ্যক মৃত জেলিফিশ ভেসে আসায় স্থানীয় জেলেরা উদ্বিগ্ন ও হতাশ। মঙ্গলবার সকালে সৈকতের প্রধান এলাকা—তিন নদীর মোহনা, চর বিজয়, গঙ্গামতির চর, লেবুর বন, কাউয়ার চর ও ফাতরার বন—সহ বিভিন্ন স্থানে এসব মৃত জেলিফিশ পাওয়া গেছে।

স্থানীয়দের মতে, এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। গত জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেও কয়েক দিন ধরে সমুদ্র থেকে জেলিফিশ ভেসে এসেছিল। তবে এবারের মৃত জেলিফিশের আকার তুলনামূলক বড় এবং সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

পরিবেশ ও মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জেলিফিশের এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার ট্রলার ও মা-চিংড়ি আহরণে ব্যবহৃত ট্রলিং জাহাজের জালে আটকা পড়ে ব্যাপকসংখ্যক জেলিফিশ মারা যেতে পারে। মৃত্যুর পর জোয়ারের পানির সঙ্গে তাদের মৃতদেহ উপকূলীয় অঞ্চলে ভেসে আসে।

তাদের মতে, সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার তারতম্য এবং অক্সিজেনের ঘাটতিও জেলিফিশ মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ।

অন্যদিকে, স্থানীয় জেলেরা পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধির পাশাপাশি বয়সজনিত কারণে জেলিফিশ স্রোতের বিপরীতে চলতে না পারা এবং হঠাৎ পরিবেশগত পরিবর্তনকেও বড় ভূমিকা বলে মনে করছেন।

জেলেরা এ পরিস্থিতি নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে। স্থানীয় জেলে রহমান মাঝি বলেন, “আমরা এখন গভীর সমুদ্রে যাচ্ছি না, কাছাকাছি এলাকা থেকেই মাছ ধরছি। কিন্তু জেলিফিশের এত প্রবল উপস্থিতি জাল ফেলা ও তোলা কঠিন করে দিয়েছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে মাছ ধরার কাজ সীমিত হয়ে যেতে পারে।”
অন্য জেলে হেলাল বলেন, “জাল তুললেই প্রচুর মৃত জেলিফিশ উঠে আসে। এতে হাত-পা জ্বালা করছে, জালেরও ক্ষতি হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—মাছ তেমন পাওয়া যাচ্ছে না।”

পরিবেশ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনও উদ্বিগ্ন। উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের (উপরা) আহ্বায়ক কে এম বাচ্চু বলেন, “অপরিকল্পিত ট্রলিং, নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার এবং সামুদ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণে এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।”
কুয়াকাটার ডলফিন রক্ষা কমিটির সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষার আরও সতর্ক করে বলেন, “জেলিফিশ সামুদ্রিক খাদ্যচক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এদের অস্বাভাবিক মৃত্যু ডলফিনসহ অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন।”

কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, “অতিরিক্ত ট্রলিং, জালের ঘর্ষণ এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে জেলিফিশের মৃত্যু হতে পারে। প্রয়োজন হলে সাগরে জরিপ চালিয়ে প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা হবে।”
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানুষের কর্মকাণ্ড—দুটিই জেলিফিশের অস্বাভাবিক মৃত্যুর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে।”

কুয়াকাটায় মৃত জেলিফিশের সম্ভাব্য কারণ

কারণবিশদ বিবরণ
ট্রলিং জাহাজের জালগভীর সমুদ্রে মাছ ধরার সময় জেলে আটকে মৃত্যু
সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধিপানির উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে অক্সিজেনের ঘাটতি
লবণাক্ততার পরিবর্তনঅতিরিক্ত বা কম লবণাক্ততা জেলিফিশের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে
বয়সজনিত কারণে মৃত্যুবৃদ্ধ বা দুর্বল জেলিফিশ স্রোতের বিপরীতে চলতে পারছে না
পরিবেশগত পরিবর্তনজলের গতি, দূষণ ও মানসিক চাপ জেলিফিশের মৃত্যুর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে

এ ঘটনায় জেলেরা ক্ষতির পাশাপাশি মাছ ধরার কার্যক্রমও সীমিত হচ্ছে। স্থানীয় ও বৈজ্ঞানিক দিক থেকে এই সমস্যার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন, না হলে সামুদ্রিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়বে।