খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ই জুন ২০২৬, ৩:৫৭ পিএম

কুমিল্লা নগরের কাটাবিল এলাকায় মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইথান আহমেদ (১২) গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। আহত শিশুটির বাবা ইউনুস মিয়া বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলাটি করেন। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে ইতোমধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, মামলার অধিকাংশ আসামিই ওই এলাকার চিহ্নিত মাদক কারবারি।
শুক্রবার সকালে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তৌহিদুল আনোয়ার মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, তদন্তের স্বার্থে আসামিদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। মামলায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে আরও পাঁচ থেকে ছয়জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া শ্রাবণ (২২) মামলার এজাহারে নামভুক্ত না হলেও ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে পুলিশের সন্দেহ। তাঁকে আদালতে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
আহত শিক্ষার্থী ইথান আহমেদের বাবা ইউনুস মিয়া কুমিল্লা নগর উদ্যানে একটি রাইড পরিচালনা করেন। তিনি বলেন, তাঁর ছেলে কোনো ধরনের অপরাধ বা বিরোধে জড়িত ছিল না। স্কুলে টিফিনের সময় বাইরে বের হওয়ার পর সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে তার পিঠে গুলি লাগে। তাঁর অভিযোগ, নিরীহ এক শিশুকে এভাবে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে এলাকায় সন্ত্রাস ও মাদক কারবার কতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। তিনি দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
ইথানের মা সোনিয়া আক্তার জানান, কাটাবিল এলাকায় অপু ও সাব্বির নামে দুটি পক্ষের মধ্যে কয়েক দিন ধরেই মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ চলছিল। সেই বিরোধের জেরে সংঘর্ষের সময় তাঁদের একমাত্র ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়। তিনি বলেন, পরিবারের একমাত্র সন্তানের জীবন নিয়ে এখন তারা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
পুলিশ জানায়, কাটাবিল এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে কয়েকটি পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। বুধবার রাতে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার দুপুরে স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগে মাদকবিরোধী মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর একদল অস্ত্রধারী সেখানে হামলা চালালে সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এতে ইথান আহমেদসহ অন্তত পাঁচজন আহত হন। গুরুতর আহত ইথানকে প্রথমে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, ইথানের পিঠে প্রবেশ করা গুলি তার ফুসফুসেও আঘাত করেছে। হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের শয্যা খালি না থাকায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত ঢাকায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ঘটনার পর পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের একাধিক দল অভিযানে নেমেছে। তবে অভিযুক্তদের অধিকাংশই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে রাতে ইথানের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন কুমিল্লা-৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। তিনি এলাকায় মাদক পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্যে যদি একজন স্কুলছাত্রও নিরাপদে স্কুলে যেতে না পারে, তাহলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
পরে কুমিল্লা সার্কিট হাউসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেন, শহরে মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে একজন শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরেছে। তিনি মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন এবং প্রয়োজন হলে বিষয়টি উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছেও তুলে ধরার কথা জানান।
এই ঘটনার পর কাটাবিল এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মাদক কারবার ও সশস্ত্র আধিপত্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে আরও নিরীহ মানুষ সহিংসতার শিকার হতে পারেন। তাঁদের দাবি, শুধু অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার নয়, এলাকায় মাদক ব্যবসার মূল নেটওয়ার্ক ভেঙে দিয়ে স্থায়ীভাবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
মন্তব্য