কাঠামোগত দুর্বলতায় আড়াল হচ্ছে খেলাপি ঋণের বাস্তবতা

দেশের অর্থনীতি গত কয়েক বছর ধরে বহুমুখী চাপে রয়েছে। অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক নানা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কারণে বিদ্যমান সংকটগুলো আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতির কয়েকটি সূচকে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলেও তা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দেয় না। কারণ, এসব সূচকের আড়ালে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা এখনো বহাল রয়েছে। অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে প্রয়োজন কার্যকর সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি : উত্তরণকালীন সময়ে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এই ব্রিফিংয়ে বক্তব্য দেন সংস্থাটির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনসহ অন্যান্য গবেষক।

সিপিডির মতে, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার কিছুটা কমলেও সেটিকে প্রকৃত অর্থে উন্নতির সূচক হিসেবে দেখা যায় না। ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের মার্চে কমে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে এই হ্রাস মূলত ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন এবং রাইট-অফের মতো ব্যবস্থার প্রভাবে হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ চিত্র প্রতিফলিত হচ্ছে না।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে ১৭টি ব্যাংকের সম্পদমান পর্যালোচনা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি ব্যাংকের পর্যালোচনায় প্রকাশিত হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি খেলাপি ঋণের তথ্য পাওয়া গেছে। এতে ব্যাংকগুলোর প্রকাশিত আর্থিক তথ্য ও প্রকৃত অবস্থার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্যের ইঙ্গিত মিলেছে।

ব্যাংকিং খাতের কয়েকটি সূচক

সূচকপূর্ববর্তী অবস্থাসর্বশেষ অবস্থা
খেলাপি ঋণের হার৩৫.৭% (সেপ্টেম্বর ২০২৫)৩২.২৬% (মার্চ ২০২৬)
অতিরিক্ত তারল্যের হার৪৩% (মে ২০২৫)৫৫% (মার্চ ২০২৬)
ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর)০.৮৯০.৮৪
সম্পদমান পর্যালোচনায় অন্তর্ভুক্ত ব্যাংক১৭টি
পর্যালোচনায় বেশি খেলাপি ঋণ শনাক্ত৬টি ব্যাংক

সিপিডির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে তারল্য বাড়লেও ঋণ বিতরণে সতর্কতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে মোট তরল সম্পদের বিপরীতে অতিরিক্ত তারল্যের হার ছিল ৪৩ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের মার্চে বেড়ে ৫৫ শতাংশে পৌঁছায়। একই সময়ে ঋণ-আমানত অনুপাত ০.৮৯ থেকে কমে ০.৮৪ হয়েছে। এর অর্থ, ব্যাংকগুলোর হাতে অর্থ থাকলেও ঋণ বিতরণে তারা তুলনামূলকভাবে সংযত অবস্থান গ্রহণ করছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদাও দুর্বল রয়েছে।

রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রেও উদ্বেগের কথা তুলে ধরে সিপিডি। সংস্থাটির মতে, চলতি অর্থবছরের রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবতার তুলনায় অনেক বেশি উচ্চাভিলাষী হয়ে পড়েছে। জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে রাজস্ব আদায় বেড়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৯ শতাংশ। নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে ৮৪ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা বাস্তবে অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন।

রাজস্ব পরিস্থিতির সংক্ষিপ্ত চিত্র

সূচকতথ্য
জুলাই-মার্চ সময়ে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি৬.৯%
লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শেষ প্রান্তিকে প্রয়োজনীয় প্রবৃদ্ধি৮৪.৬%
জুলাই-এপ্রিল সময়ে রাজস্ব ঘাটতি১,০৪,৫৩৩ কোটি টাকা

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর আদায়ে কিছু উন্নতি দেখা গেলেও জুলাই-এপ্রিল সময়ে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের রাজস্বসংক্রান্ত শর্ত পূরণ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রেও স্বস্তির সুযোগ সীমিত বলে মনে করছে সিপিডি। ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দীর্ঘ সময় ধরে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে এবং জ্বালানি, পরিবহন ও সেবা খাতের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত আছে।

মূল্যস্ফীতির চিত্র (এপ্রিল ২০২৬)

সূচকহার
সার্বিক মূল্যস্ফীতি৯.০৪%
খাদ্য মূল্যস্ফীতি৮.৩৯%
খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি৯.৫৭%
মজুরি বৃদ্ধির হার৮.১৬%

তিনি জানান, মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ হলেও তা মূল্যস্ফীতির হারের নিচে অবস্থান করছে। ফলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। সিপিডির মতে, অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে যে সাময়িক স্বস্তি দেখা যাচ্ছে, তা স্থায়ী করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দূর করা, আইন ও বিধিবিধানের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং জবাবদিহি জোরদারের পাশাপাশি কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন জরুরি। অর্থনীতির গভীরে থাকা অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর সমাধান ছাড়া বর্তমান ইতিবাচক প্রবণতাগুলো দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সুযোগ সীমিত।