বাংলাদেশের আধুনিক সঙ্গীত ভুবনের অন্যতম সুপরিচিত এবং গুণী কণ্ঠশিল্পী দিলশাদ নাহার কনা। সুরের মাধুর্য এবং গানের বৈচিত্র্যের কারণে তিনি দেশের শ্রোতামহলে অত্যন্ত সমাদৃত। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি একটি সঙ্গীত দলের সাথে যুক্ত থেকে গানের চর্চা শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে একক শিল্পী হিসেবে নিজের অবস্থান সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। বিশেষ করে বাংলা চলচ্চিত্র এবং ছোট পর্দার নাটকের নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তিনি এক অগ্রগণ্য নাম। তবে তাঁর এই বর্তমান সফলতা রাতারাতি আসেনি, বরং দীর্ঘ বছরের একনিষ্ঠ সাধনা ও নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি আজকের এই সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন।
Table of Contents
সাম্প্রতিক সঙ্গীত কর্মব্যস্ততা ও তথ্যের বিবরণ
পবিত্র ঈদুল আজহার এই আনন্দঘন সময়েও শিল্পী কনা নতুন নতুন গান নিয়ে শ্রোতাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তি পাওয়া ‘মালিক’ নামক চলচ্চিত্রে তাঁর গাওয়া ‘দিলাম তোমায় কথা’ গানটি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এর পাশাপাশি ‘তাজমহল’ নামের একটি ওয়েব চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠের ‘সোহাগ চাঁদ’ গানসহ অন্যান্য গানগুলোও বেশ প্রশংসিত হয়েছে। এই উৎসবের মৌসুমে বিভিন্ন চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশন নাটকে তাঁর গাওয়া বেশ কিছু নতুন গান পর্যায়ক্রমে মুক্তি পাচ্ছে।
শিল্পী কনার সঙ্গীত জীবন এবং সাম্প্রতিক কাজের মূল তথ্যসমূহ নিচে একটি সারণির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| মূল বিষয়সমূহ | তথ্যের বিবরণ ও প্রেক্ষাপট |
| সঙ্গীত জীবনের সূচনা | প্রাথমিক পর্যায়ে দলগত বা ব্যান্ড সঙ্গীতের মাধ্যমে শুরু |
| প্রধান কর্মক্ষেত্র | চলচ্চিত্র ও নাটকের নেপথ্য সঙ্গীত এবং একক পরিবেশনা |
| সাম্প্রতিক চলচ্চিত্রের গান | ‘দিলাম তোমায় কথা’ (চলচ্চিত্রের নাম: মালিক) |
| সাম্প্রতিক ওয়েব চলচ্চিত্রের গান | ‘সোহাগ চাঁদ’ (চলচ্চিত্রের নাম: তাজমহল) |
| উৎসবের বিশেষ কাজ | ঈদ উপলক্ষে একাধিক নতুন চলচ্চিত্র ও নাটকের গান মুক্তি |
শৈশবের গ্রামীণ স্মৃতি ও উঠোনের টেলিভিশন
নিজের শৈশবের ঈদের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে কনা জানান, তাঁর শৈশব ও বেড়ে ওঠা মূলত ঢাকা শহরেই সম্পন্ন হয়েছে। তবে ছোটবেলার দিনগুলোতে বেশ কয়েকবার ঈদুল আজহা উদ্যাপন করতে তিনি পরিবারের সাথে গ্রামে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে বছরের অন্য প্রধান উৎসব ঈদুল ফিতর বা রোজার ঈদটি বেশির ভাগ সময় ঢাকাতেই উদ্যাপন করা হতো। বর্তমানে পেশাগত দায়িত্ব এবং কাজের অতিরিক্ত চাপের কারণে ঈদের দিনগুলোতে আর আগের মতো গ্রামে যাওয়া সম্ভব হয় না।
শৈশবে গ্রামে কাটানো ঈদুল আজহার একটি বিশেষ স্মৃতি তাঁর মনে আজও অম্লান হয়ে আছে। সেই সময়ে গ্রামীণ জনপদে বর্তমানের মতো ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ বা টেলিভিশনের সুবিধা ছিল না। তাঁদের গ্রামে একটি ছোট টেলিভিশন ছিল যা ব্যাটারির সাহায্যে চালানো হতো। ঢাকায় সেই টেলিভিশনটি ঘরের ভেতরে রাখা হলেও গ্রামে ঈদের সময়ে সেটি বাড়ির উন্মুক্ত উঠানে নিয়ে আসা হতো।
ঈদের দিনগুলোতে বিকেল আনুমানিক তিনটার দিকে তাঁর বাবা উঠানের সেই ব্যাটারিচালিত টেলিভিশনটি চালু করতেন। আর সেই টেলিভিশন দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে পুরো গ্রামের মানুষ এসে উঠানে ভিড় জমাতেন। সবাই অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে একসাথে বসে ঈদের বিশেষ চলচ্চিত্র উপভোগ করতেন। ঈদের টানা তিন দিন ধরে এই চলচ্চিত্র প্রদর্শনী চলত এবং গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতা সেখানে সমবেত হতেন। কনার মতে, বর্তমান যুগের আধুনিক শিশুরা হয়তো ধারণাই করতে পারবে না যে কীভাবে একটি মাত্র টেলিভিশনকে কেন্দ্র করে পুরো গ্রামের মানুষ এভাবে একত্রিত হতে পারত। তৎকালীন সময়ে সবাই টেলিভিশনের নির্দিষ্ট সময়সূচি দেখে সারাদিন ধরে নাটক ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন।
পারিবারিক সমর্থন ও সুরের হাতেখড়ি
একেবারে অল্প বয়স থেকেই কনার সঙ্গীত চর্চার সূত্রপাত ঘটেছিল। তাঁদের পরিবারে একটি সুন্দর নিয়ম প্রচলিত ছিল যে, প্রতি রাতে তিনি হারমোনিয়াম নিয়ে বসতেন এবং সুরের সাধনা করতেন। সেই সময়ে পরিবারের সব সদস্য সেখানে উপস্থিত থেকে তাঁর গান শুনতেন। যখনই তিনি কোনো নতুন গান শিখতেন, বাড়ির গুরুজনেরা অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে তা শুনতেন এবং নতুন গানের কথা জানতে চাইতেন। শৈশবের দিনগুলোতে এই বিষয়টি তাঁর কাছে কিছুটা বিরক্তিকর মনে হলেও, এখন প্রাপ্ত বয়সে এসে এটিকে অত্যন্ত মধুর একটি স্মৃতি বলে তাঁর মনে হয়।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, পরিবারের এমন অকুন্ঠ সমর্থন ও উৎসাহ ছিল বলেই তিনি আজ সঙ্গীত ক্ষেত্রে এতদূর আসতে পেরেছেন। বর্তমান সমাজে অনেকেই যখন সঙ্গীত চর্চায় পরিবারের সহযোগিতা না পাওয়ার আক্ষেপ করেন, তখন কনা নিজেকে অত্যন্ত ভাগ্যবান মনে করেন।
জীবনের ত্যাগ ও দায়িত্ববোধের প্রকাশ
পবিত্র ঈদুল আজহার মূল আদর্শ যে ত্যাগ, সেটিকে কনা নিজের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতার সাথে গভীরভাবে মিলিয়ে দেখেন। তাঁর মতে, মানুষের জীবনের প্রতিটি দিনই কোনো না কোনো ত্যাগের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। পেশাগত কর্মব্যস্ততার কারণে তিনি তাঁর পরিবারকে যতটুকু সময় দেওয়া উচিত, ততটুকু দিতে পারেন না। তাঁর বাবা-মা এখন বয়োবৃদ্ধ, জীবনের এই পর্যায়ে তাঁদের সন্তান হিসেবে অনেক বেশি সময় ও যত্ন দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। তিনি তাঁদের দেখাশোনা করলেও পর্যাপ্ত সময় উৎসর্গ করতে পারেন না।
নিজের যাপিত জীবনের একটি সাধারণ উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সকালে যখন তিনি প্রাতরাশ শেষ করে কাজের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হন, তখন পরিবারের অন্য সদস্যরা একসাথে বসে চা পান করেন ও গল্প করেন। তাঁরও খুব ইচ্ছা করে সেই পারিবারিক আড্ডায় কিছুক্ষণ সময় কাটাতে, কিন্তু পেশাগত দায়িত্বের কারণে তাঁকে দ্রুত চলে যেতে হয়। এই ব্যস্ততার কারণে তিনি পরিবার ও বন্ধুদের অনেক সামাজিক অনুষ্ঠানেও উপস্থিত হতে পারেন না। বিশেষ করে পহেলা বৈশাখ বা অন্যান্য উৎসবের দিনগুলোতে বিনোদন জগতের কর্মী হিসেবে সাধারণ মানুষের চেয়ে তাঁদের কাজের চাপ অনেক বেশি থাকে। তবে এর মাঝেও তিনি সান্ত্বনা ও আনন্দ খুঁজে পান এই ভেবে যে, তাঁর সমস্ত পরিচিতি ও শ্রোতাদের ভালোবাসা দর্শকদের কল্যাণে। দর্শকদের বিনোদন দিতে পারার মাঝেই তিনি নিজের জীবনের পূর্ণতা ও মানসিক তৃপ্তি খুঁজে পান।
বর্তমান সময়ের ঈদ আর শৈশবের ঈদের মধ্যে একটি বড় ধরনের মানসিক পার্থক্য অনুভব করেন এই শিল্পী। এখন ঈদের নতুন পোশাক কেনা কিংবা কোরবানির পশু কেনাকাটা—সবকিছুই এক ধরনের যান্ত্রিক দায়িত্ব বলে মনে হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি তাঁর কাছে পূর্বের সেই স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দের চেয়ে একটি নিয়মে পরিণত হয়েছে। তিনি তাঁর মায়ের কাছেও ব্যক্ত করেছেন যে, হয়তো বয়স বেড়ে যাওয়ার কারণে অথবা চারপাশের পরিবেশ যান্ত্রিক হয়ে ওঠার কারণে শৈশবের সেই উৎসবমুখর আনন্দময় অনুভূতিগুলো এখন আর আগের মতো খুঁজে পাওয়া যায় না, যা তাঁকে কিছুটা বিষণ্ণ করে তোলে।
এতকিছুর পরেও কনা ঈদের দিনটি পরিবারের সাথেই কাটানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেন। ঈদের দিন তিনি অন্য সব কাজ থেকে বিরত করে ঘরেই অবস্থান করেন এবং আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিত সবাইকে নিজ গৃহে আমন্ত্রণ জানান। তিনি নিজে রান্নাবান্না করেন এবং সবাই মিলে একসাথে খাওয়া-داওয়া ও গল্পগুজব করেন। বছরের অন্যান্য সাধারণ দিনগুলোতে পরিবারকে সময় দিতে না পারার অভাবটি তিনি ঈদের এই বিশেষ দিনটিতে পূরণ করার চেষ্টা করেন। কনার কাছে বর্তমানের ঈদ হলো শৈশবের স্মৃতিচারণ, পারিবারিক দায়িত্ব পালন এবং কর্মব্যস্ত জীবনের মাঝে প্রিয়জনদের সাথে আবেগঘন সময় কাটানোর এক অপূর্ব মেলবন্ধন।
