খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ই জুলাই ২০২৬, ৪:৩৭ পিএম

বীমা খাতে দাবি নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রতা একসময় ছিল গ্রাহকদের সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি। দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পর ক্ষতিপূরণ পেতে অপেক্ষা করতে হতো দিনের পর দিন। সার্ভেয়ার ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিদর্শন করতেন, প্রতিবেদন তৈরি হতো, এরপর শুরু হতো নথি যাচাই ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। অনেক ক্ষেত্রেই একটি সাধারণ দাবি নিষ্পত্তি করতে সাত থেকে ১৪ দিন, কখনও তারও বেশি সময় লেগে যেত।
প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন বীমা খাতে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘রিমোট ক্লেইম অ্যাসেসমেন্ট’ বা দূরবর্তী দাবি মূল্যায়ন ব্যবস্থা। এই পদ্ধতিতে গ্রাহক নিজেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের ছবি, ভিডিও কিংবা সরাসরি ভিডিও ধারণ করে বীমা প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠান। এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কম্পিউটার ভিশন এবং স্বয়ংক্রিয় বিশ্লেষণ প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই তথ্য যাচাই করে প্রাথমিক মূল্যায়ন সম্পন্ন করা হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে, আবার কিছু ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটেই দাবি অনুমোদনের প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব হচ্ছে।
বীমা খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রযুক্তি শুধু একটি নতুন সেবা নয়; এটি পুরো দাবি মূল্যায়ন ব্যবস্থার কাঠামোই পরিবর্তন করছে। যেখানে আগে প্রতিটি ঘটনায় সার্ভেয়ারকে সরেজমিনে যেতে হতো, সেখানে এখন অধিকাংশ কাজই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সম্পন্ন করা যাচ্ছে। বিভিন্ন বৈশ্বিক শিল্প বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আধুনিক ডিজিটাল ক্লেইম ব্যবস্থা চালুর ফলে দাবি নিষ্পত্তির সময় গড়ে ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসে।
গ্রাহকদের অভিজ্ঞতাও বদলে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। আগে একটি দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ পেতে সপ্তাহের পর সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হলেও এখন অনেক দাবি ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই নিষ্পত্তি হচ্ছে। এমনকি তুলনামূলক সহজ ও কম ঝুঁকির কিছু দাবিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর স্বয়ংক্রিয় অনুমোদন ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান, চীন, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতসহ উন্নত ও উদীয়মান অনেক দেশের বীমা বাজারে এই প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। বিভিন্ন ইনসুরটেক প্রতিষ্ঠান এবং বীমা শিল্পের গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এসব বাজারে ইতোমধ্যে কয়েক মিলিয়নেরও বেশি দাবি দূরবর্তী মূল্যায়ন পদ্ধতিতে নিষ্পত্তি হয়েছে এবং ব্যবহারকারীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
রিমোট ক্লেইম অ্যাসেসমেন্ট জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো সময় সাশ্রয়, ব্যয় হ্রাস এবং পুরো প্রক্রিয়ার সরলীকরণ। আগে যেখানে একটি সাধারণ দাবি নিষ্পত্তিতে এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগত, সেখানে উন্নত ডিজিটাল ব্যবস্থায় তা নেমে এসেছে এক থেকে দুই দিনে। এতে গ্রাহক দ্রুত ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন, অন্যদিকে বীমা কোম্পানিগুলোর প্রশাসনিক চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে।
গ্রাহকসেবার মানেও এসেছে নতুন মাত্রা। এখন অনেক প্রতিষ্ঠান মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে দাবি জমা দেওয়া, নথি আপলোড, অগ্রগতির অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং চূড়ান্ত অর্থপ্রদানের সুবিধা দিচ্ছে। ফলে গ্রাহককে আর বারবার অফিসে যেতে হচ্ছে না কিংবা কাগজপত্র নিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিজিটাল ক্লেইম ব্যবস্থার ফলে গ্রাহক সন্তুষ্টি বাড়ছে এবং অভিযোগের হারও কমে আসছে।
এই ব্যবস্থার পেছনে একাধিক প্রযুক্তি একসঙ্গে কাজ করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্ষতির প্রাথমিক মূল্য নির্ধারণে সহায়তা করে, কম্পিউটার ভিশন ছবির সূক্ষ্ম তথ্য বিশ্লেষণ করে এবং স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা দেয়। দুর্গম এলাকা বা বিস্তীর্ণ ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রে ড্রোন ব্যবহার করে আকাশপথ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। আবার বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে স্যাটেলাইটচিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে ক্ষতির বিস্তৃত চিত্র মূল্যায়ন করা সম্ভব হচ্ছে।
বীমা কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় কমাতেও এই প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখছে। মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন, যানবাহন পরিচালনা এবং লজিস্টিক ব্যয়ের প্রয়োজন কমে যাওয়ায় বিভিন্ন শিল্প প্রতিবেদনে দাবি ব্যবস্থাপনার ব্যয় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে একই সম্পদ ব্যবহার করেই প্রতিষ্ঠানগুলো আরও বেশি গ্রাহককে দ্রুত সেবা দিতে পারছে।
প্রথমদিকে অনেকের আশঙ্কা ছিল, দূর থেকে দাবি মূল্যায়নের ফলে প্রতারণার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। তবে বাস্তবে প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন। এখন ছবি ও ভিডিওর জিও-ট্যাগিং, সময়ের তথ্য, মেটাডেটা যাচাই এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতারণা শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কোনো ছবি কোথায়, কখন এবং কীভাবে ধারণ করা হয়েছে তা যাচাই করা সম্ভব হওয়ায় জালিয়াতি শনাক্ত করা আগের তুলনায় আরও কার্যকর হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
পরিবেশগত দিক থেকেও এই পরিবর্তন ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পরিদর্শনের জন্য যাতায়াত কমে যাওয়ায় জ্বালানির ব্যবহার এবং যানবাহন থেকে কার্বন নিঃসরণও হ্রাস পাচ্ছে। পরিবেশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সুশাসনভিত্তিক বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিটি দাবি ডিজিটালভাবে নিষ্পত্তি হলে গড়ে প্রায় ৮ থেকে ১০ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে বীমা খাতে ডিজিটাল সেবার পরিধি বাড়ছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে মোবাইলভিত্তিক দাবি গ্রহণ ও প্রক্রিয়াকরণের সুবিধা চালু করেছে। তবে পূর্ণাঙ্গ রিমোট ক্লেইম অ্যাসেসমেন্ট এখনো সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ ধাপে ধাপে ডিজিটাল রূপান্তরের উপযোগী নীতিমালা উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, যা ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রিমোট ক্লেইম অ্যাসেসমেন্ট এখন আর পরীক্ষামূলক কোনো ধারণা নয়; এটি বৈশ্বিক বীমা শিল্পের দ্রুত বিস্তার লাভ করা একটি বাস্তব কার্যপদ্ধতি। দ্রুত সেবা, ব্যয় সাশ্রয়, স্বচ্ছতা এবং গ্রাহকবান্ধব প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে এই প্রযুক্তি বীমা খাতকে নতুন এক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, সেবা পাওয়ার জন্য এখন আর গ্রাহককে অপেক্ষা করতে হচ্ছে না; প্রযুক্তির মাধ্যমে বীমা সেবাই পৌঁছে যাচ্ছে গ্রাহকের হাতের মুঠোয়।
মন্তব্য