এমএস অ্যান্ড এডি-র মুনাফায় স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস

জাপান ভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় বীমা প্রতিষ্ঠান এমএস অ্যান্ড এডি ইন্স্যুরেন্স গ্রুপ হোল্ডিংস (MS&AD Insurance Group Holdings) ২০২৫ অর্থ বছরে তাদের পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ২৪০ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন বেশি সমন্বিত মুনাফা অর্জন করেছে। এই অভাবনীয় সাফল্যের পরও প্রতিষ্ঠানটি ধারণা করছে যে, ২০২৬ অর্থ বছরে তাদের সামগ্রিক মুনাফা মূলত স্থিতিশীল বা অপরিবর্তিত থাকবে। আর্থিক গবেষণা ও রেটিং পরিচালনাকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা মর্নিংস্টার (Morningstar)-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

মর্নিংস্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থ বছরে এমএস অ্যান্ড এডি ইন্স্যুরেন্স গ্রুপ হোল্ডিংস মোট ৬.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১.০০১ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন সমন্বিত নিট মুনাফা (Adjusted Profit) অর্জন করেছে। এই অসামান্য অর্জনের পেছনে বেশ কয়েকটি ইতিবাচক আর্থিক দিক বড় ভূমিকা পালন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে পুঁজিবাজারে ইকুইটি বা শেয়ার বিক্রয় থেকে উচ্চ মুনাফা লাভ, তুলনামূলক কম প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ক্ষয়ক্ষতি বা ক্যাটাস্ট্রফি লস এবং বিনিয়োগ খাত থেকে অর্জিত শক্তিশালী আয়। তবে ২০২৬ অর্থ বছরের জন্য প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দেওয়া নির্দেশিকা বা গাইডেন্সে কিছুটা দুর্বল এবং সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করা হয়েছে। যদি শেয়ার বিক্রয় থেকে অর্জিত মুনাফাকে হিসাবের বাইরে রাখা হয়, তবে আগামী অর্থ বছরে কোম্পানির সমন্বিত মুনাফা মূলত সমান্তরাল বা ফ্ল্যাট থাকবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

শেয়ারহোল্ডারদের রিটার্ন ও অভ্যন্তরীণ মুনাফার চিত্র

মর্নিংস্টারের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৬ অর্থ বছরে শেয়ার বিক্রয় থেকে অর্জিত মুনাফার লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৭৮৭.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১২৫ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই বিষয়টি কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের রিটার্ন বা লভ্যাংশের ওপর এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

একই সাথে, শেয়ার বিক্রির মুনাফা বাদ দিলে ২০২৬ অর্থ বছরে প্রতিষ্ঠানটির জাপানের অভ্যন্তরীণ নন-লাইফ বীমা (Domestic Non-life Insurance) খাতের মুনাফাও কিছুটা হ্রাস পেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই হ্রাসের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ক্যাটাস্ট্রফি লস বা প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আবার স্বাভাবিক বা পূর্বের সাধারণ স্তরে ফিরে আসার সম্ভাবনাকে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, বীমা পলিসির প্রিমিয়ামের হার বৃদ্ধি এবং কোম্পানির অভ্যন্তরীণ পরিচালন ব্যয় কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখার কারণে কোম্পানির মূল বা অন্তর্নিহিত মুনাফাযোগ্যতা (Underlying Profitability) ক্রমান্বয়ে উন্নত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ ও কৌশলগত বিনিয়োগ

জাপানের অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বা ওভারসিজ বাজারেও এমএস অ্যান্ড এডি তাদের অবস্থান মজবুত করছে। ২০২৬ অর্থ বছরে কোম্পানির বৈদেশিক সমন্বিত মুনাফা প্রায় ১ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই আন্তর্জাতিক প্রবৃদ্ধির পেছনে মূল অবদান থাকবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা প্রতিষ্ঠান ডব্লিউ. আর. বার্কলি (W.R. Berkley)-র। এই মার্কিন সংস্থায় এমএস অ্যান্ড এডি বড় ধরনের কৌশলগত বিনিয়োগ করেছে এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত ইকুইটি আয় কোম্পানির বৈচ্ছিক মুনাফাকে সচল রাখবে।

মর্নিংস্টারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ডব্লিউ. আর. বার্কলি এবং ব্যারিংস (Barings)-এর মতো বৈচ্ছিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে এমএস অ্যান্ড এডি-র এই দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই পদক্ষেপের ফলে প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক স্পেশাল্টি ইন্স্যুরেন্স বা বিশেষায়িত বীমা বাজারে তাদের সমসাময়িক অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির সাথে বিদ্যমান ব্যবসায়িক ব্যবধান সফলভাবে কমিয়ে আনতে পারবে। বিশেষ করে লয়েডস (Lloyd’s) এবং পুনর্বীমা বা রেইন্সিউরেন্স (Reinsurance) খাত থেকে অর্জিত আয় স্থিতিশীল হওয়ার সাথে সাথে এই লক্ষ্য পূরণ করা আরও সহজ হবে।

দীর্ঘমেয়াদী প্রিমিয়াম, রাজস্ব এবং নিট আয়ের পূর্বাভাস

আগামী কয়েক বছরের জন্য এমএস অ্যান্ড এডি ইন্স্যুরেন্স গ্রুপের প্রিমিয়াম বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক আর্থিক সূচকের একটি ধারাবাহিক ইতিবাচক প্রাক্কলন বা পূর্বাভাস দিয়েছে মর্নিংস্টার। এই পূর্বাভাস অনুযায়ী কোম্পানির মূল আর্থিক সূচকগুলোর অগ্রগতির চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

আর্থিক সূচক ও প্রবৃদ্ধির রূপরেখা:

  • নেট আর্নড প্রিমিয়াম (Net Earned Premiums): ২০২৬ অর্থ বছরে কোম্পানির অর্জিত নিট প্রিমিয়ামের পরিমাণ যেখানে ৩৬.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৫.৭৬ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন থাকবে বলে ধরা হয়েছে, তা ২০২৭ অর্থ বছরে বৃদ্ধি পেয়ে ৩৮.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৬.০৮ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েনে পৌঁছাবে। এই প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রেখে ২০২৮ অর্থ বছরে তা আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৪০.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৬.৪১ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন স্পর্শ করবে।

  • মোট রাজস্ব (Total Revenue): ২০২৬ অর্থ বছরে প্রতিষ্ঠানের মোট রাজস্ব ৪৫.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৭১.২৮ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ২০২৭ অর্থ বছরে এটি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াবে ৪৮.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৭.৭০ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন এবং ২০২৮ অর্থ বছরে তা আরও শক্তিশালী হয়ে ৫১.০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৮.০৯ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েনে উন্নীত হবে।

  • নিট আয় (Net Income): কোম্পানির নিট আয়ের ক্ষেত্রেও ধারাবাহিক উন্নতি আশা করা হচ্ছে। ২০২৬ অর্থ বছরে নিট আয় ৫.০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৭৮৭.৩৪ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ২০২৭ অর্থ বছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৫.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৮১৫.৮৯ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন এবং ২০২৮ অর্থ বছরে ৫.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৮৩৮.১৬ বিলিয়ন জাপানি ইয়েনে পৌঁছাবে।

  • শেয়ার প্রতি মিশ্রিত আয় (Diluted EPS): কোম্পানির ব্যবসায়িক পরিধি বৃদ্ধির সাথে সাথে শেয়ারহোল্ডারদের প্রতি শেয়ারের মিশ্রিত আয় বা ডাইলুটেড আর্নিংস পার শেয়ারও বৃদ্ধি পাবে। ২০২৬ অর্থ বছরে প্রতি শেয়ারের আয় যেখানে ৩.৩৩ মার্কিন ডলার বা ৫২৮.৮৭ জাপানি ইয়েন থাকবে, তা ২০২৭ অর্থ বছরে বৃদ্ধি পেয়ে ৩.৫৬ মার্কিন ডলার বা ৫৬৪.৮৫ জাপানি ইয়েন হবে। সর্বশেষে, ২০২৮ অর্থ বছরে এই আয়ের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৩.৭৬ মার্কিন ডলার বা ৫৯৬.৮৭ জাপানি ইয়েন হবে বলে মর্নিংস্টারের প্রতিবেদনে প্রাক্কলন করা হয়েছে।