বাংলাদেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী তৈরি পোশাক খাত বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এই বিদ্যমান সংকটের সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে এক্সপোর্ট ক্রেডিট গ্যারান্টি বীমা (Export Credit Guarantee Insurance) দ্রুত কমে যাওয়ার প্রবণতা। আন্তর্জাতিক বাজারে বাণিজ্য ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং দেশীয় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণে এই বীমা সুবিধা সংকুচিত হচ্ছে, যা রপ্তানি খাতের সার্বিক ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
Table of Contents
রপ্তানি আয়ের নেতিবাচক ধারা ও বাজার পরিস্থিতি
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই ২০২৫ থেকে এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত) বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় ২.৮২ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৩১.৭২ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এই ধারাবাহিক পতন সাময়িক কোনো ঘটনা নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়া এবং বাণিজ্যিক ঝুঁকি বৃদ্ধির স্পষ্ট লক্ষণ। এর ফলে বৈশ্বিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ও আন্তর্জাতিক বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির বিপরীতে তাদের গ্যারান্টি কভারেজের সীমা কমিয়ে দিচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের নির্দিষ্ট সময়ে পোশাক খাতের রপ্তানি হ্রাস এবং বাজারভিত্তিক তথ্য নিচে টেবিলের মাধ্যমে প্রদর্শন করা হলো:
ক্রেডিট গ্যারান্টি বীমা হ্রাসের প্রধান কারণসমূহ
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এক্সপোর্ট ক্রেডিট গ্যারান্টি বীমা রপ্তানিকারকদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা কবচ। পণ্য বুঝে পাওয়ার পর বিদেশি ক্রেতা বা বায়ার যদি দেউলিয়া হয়ে যায় কিংবা মূল্য পরিশোধে ব্যর্থ হয়, তবে এই বীমা কোম্পানিগুলো রপ্তানিকারকদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয়। এই বীমার ওপর ভিত্তি করেই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি এবং প্রি-শিপমেন্ট অর্থায়ন সহজ করে থাকে। বর্তমান এই সুবিধা কমে যাওয়ার পেছনে প্রধানত দুটি কারণ রয়েছে:
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ: ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে, যার ফলে পোশাকের সামগ্রিক চাহিদাও হ্রাস পেয়েছে। একই সাথে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক বায়ার আর্থিক সংকটে পড়ায় তাদের অর্থ খেলাপের (ডিফল্ট) ঝুঁকি বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক বীমা কোম্পানিগুলো নিজেদের ঝুঁকি এড়াতে গ্যারান্টি লিমিট সংকুচিত করছে।
অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ঘাটতি: দেশীয় শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এর ফলে সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণ বা সরবরাহ চেইন বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না, যা আন্তর্জাতিক বীমা সংস্থাগুলোর কাছে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক ঝুঁকি রেটিং বাড়িয়ে দিয়েছে।
আর্থিক খাত ও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সামগ্রিক প্রভাব
ক্রেডিট গ্যারান্টি বীমা সুবিধা কমে যাওয়ার কারণে অনেক রপ্তানিকারক নিরুপায় হয়ে ‘오픈 অ্যাকাউন্ট’ বা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে পণ্য পাঠাচ্ছেন। এই পদ্ধতিতে ক্রেতা পণ্য পাওয়ার পর অর্থ পরিশোধ না করলে সম্পূর্ণ আর্থিক ক্ষতির দায় রপ্তানিকারককে বহন করতে হয়, যা ব্যবসায়িক ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে, নতুন বাজারে রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের চেষ্টা চললেও গ্যারান্টি সুবিধা না থাকায় উদ্যোক্তারা নতুন বাজারে পণ্য পাঠাতে অনীহা দেখাচ্ছেন।
এই সংকটের ধাক্কা লেগেছে দেশের ব্যাংকিং খাতেও। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই–জানুয়ারি সময়ে ব্যাক-টু-ব্যাক আমদানি এলসি (LC) খোলা ১০.৬৯ শতাংশ কমে গেছে। ব্যাংকাররা সতর্ক করেছেন যে, তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে ব্যাংকগুলোর দেওয়া ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখন খেলাপি বা নন-পারফর্মিং (NPL) হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। রপ্তানি বিল বিলম্বে আসা এবং গ্যারান্টি কভারেজ হ্রাসের কারণে ব্যাংকগুলো নতুন করে চলতি মূলধন (Working Capital) ঋণ দিতে অনীহা দেখাচ্ছে, যা তারল্য সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
উত্তরণের উপায় ও ভবিষ্যৎ কৌশল
অর্থনীতিবিদ এবং খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগে পুনঃবীমা স্কিম (Reinsurance Scheme) চালু করে বিকল্প ক্রেডিট গ্যারান্টি সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। একই সাথে কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা আবশ্যক। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের অংশ হিসেবে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের মধ্যে প্রচলিত নগদ প্রণোদনা ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এই অবস্থায় কম খরচে ইউটিলিটি সেবা ও উন্নত লজিস্টিকস সুবিধার মতো বিকল্প নীতি সহায়তা দেওয়া জরুরি। শুধু জিএসপি সুবিধার ওপর নির্ভর না করে পণ্য বৈচিত্র্যায়ন, বিশেষ করে ম্যান-মেইড ফাইবারভিত্তিক পোশাক উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বন্দর ও বিমানবন্দরের আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন।
