ইসলামী ব্যাংককে জামায়াতমুক্ত করার নির্দেশ ব্যাংক গভর্নরের

দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে (আইবিবিএল) সম্পূর্ণভাবে জামায়াতমুক্ত করার কড়া নির্দেশনা দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক আয়ত্ত বা নিয়ন্ত্রণ থেকে এই ব্যাংকটিকে বের করে আনার জন্য প্রশাসনিক ও আইনগত যা যা করা প্রয়োজন, তার সবকিছুই সম্পন্ন করার জন্য ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহীদের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ বৈঠক

গত রবিবার (১৪ জুন, ২০২৬) বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সদর দপ্তরে ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষস্থানীয় নির্বাহীদের সাথে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বিশেষ সভায় গভর্নর মোস্তাকুর রহমান এই কঠোর মনোভাব ও দিকনির্দেশনা ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র এই বৈঠকের আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

উক্ত বৈঠকে ইসলামী ব্যাংকের চলমান সামগ্রিক ব্যবসায়িক ও প্রশাসনিক সংকট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে গভর্নর আশ্বাস দেন যে, বর্তমান সংকট উত্তরণে এবং ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক সব ধরনের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করবে। তবে এই সহযোগিতার পাশাপাশি তিনি ব্যাংকটিকে সম্পূর্ণভাবে political প্রভাবমুক্ত এবং বিশেষত জামায়াতমুক্ত করার শর্ত জুড়ে দেন। এছাড়া বর্তমান আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকট দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে কী কী কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে, সে বিষয়ে ব্যাংকটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে লিখিত ও মৌখিক পরিকল্পনা জানতে চান গভর্নর।

গ্রাহকদের আস্থাহীনতা দূর ও চেয়ারম্যান পরিবর্তনের প্রস্তাব

বিশেষ এই সভায় উপস্থিত ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতির নানাবিধ দিক তুলে ধরেন। তাঁরা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাংকটি নিয়ে এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। এই মুহূর্তে গ্রাহকদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনাই ব্যাংকটির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

গ্রাহকদের এই আস্থাহীনতার সংকট দ্রুত দূর করার লক্ষ্যে ব্যাংকটির শীর্ষ কর্তারা বর্তমান চেয়ারম্যান পরিবর্তনের বিষয়টি গভর্নরের কাছে জোরালোভাবে উপস্থাপন করেন। কর্মকর্তাদের মতে, শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা হলে বাজারে ইতিবাচক বার্তা যাবে এবং গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা সহজ হবে।

বৈঠক সূত্রে আরও জানা গেছে, ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পরিবর্তনের এই প্রস্তাবটি বাংলাদেশ ব্যাংক অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে এবং বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতিবাচকভাবে ভাবছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় একটি বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে সভায় গভর্নর মোস্তাকুর রহমান প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্বের সংকট কাটাতে এবং নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের উদ্দেশ্যে এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকজন যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে এই পদের জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নানা পরিস্থিতির কারণে এখন পর্যন্ত প্রস্তাবিত ব্যক্তিদের কেউই এই ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করতে বা রাজি হতে সম্মতি জ্ঞাপন করেননি।

ব্যাংকের সংকট নিরসন ও ভবিষ্যৎ আইনি প্রক্রিয়া

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের শীর্ষ নির্বাহীরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই কঠোর নির্দেশনার পর নিজেদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ আলোচনা শুরু করেছেন। ব্যাংকটিকে সম্পূর্ণভাবে সুশাসনের আওতায় আনা এবং কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের একক আধিপত্য বা প্রভাব থেকে মুক্ত করার জন্য পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের আইনি প্রক্রিয়াগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের সার্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষার স্বার্থে ইসলামী ব্যাংকের মতো বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো বিশেষ রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে যেন সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকিতে না পড়ে, সেটি নিশ্চিত করতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। নতুন চেয়ারম্যান খোঁজার প্রক্রিয়াটি আরও জোরদার করা হবে এবং ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহীদের দেওয়া সংকট সমাধানের প্রস্তাবনাগুলো যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী চূড়ান্ত আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।