মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের জন্মদিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের শত্রুতা অবসানের ঘোষণা দিয়ে একটি সম্ভাব্য চুক্তির ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে ঘোষণাটি ঘিরে এখনো উল্লেখযোগ্য অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। ১৪ জুন ট্রাম্প ৮১ বছরে পদার্পণ করেন।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো হয়েছে, যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে। তিনি আরও লেখেন, “তেল প্রবাহিত হতে দিন।”
তিনি এটিও বলেন, পূর্ববর্তী মার্কিন প্রশাসনের ব্যর্থতার বিপরীতে এটি একটি “দারুণ চুক্তি”, যা পুরো অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে বলে তিনি মনে করেন। তবে একই ধরনের অতিরঞ্জিত ভাষা ব্যবহারের নজির ট্রাম্পের পূর্ববর্তী ঘোষণাতেও দেখা গেছে।
গত বছর গাজা যুদ্ধ অবসানের প্রসঙ্গে ট্রাম্প যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেখানে তিনি “চিরন্তন শান্তি” প্রতিষ্ঠার কথা বললেও বাস্তব পরিস্থিতি সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি।
উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কূটনৈতিক সমঝোতায় সাধারণত চূড়ান্ত সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ভর করে বিস্তারিত শর্তাবলীর ওপর। কিন্তু বর্তমান ঘোষণায় সেই বিস্তারিত তথ্যের ঘাটতি রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না—এ বিষয়টি চুক্তির অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং এটি যাচাই করার সক্ষমতাও যুক্তরাষ্ট্রের থাকবে।
তবে এখনো গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করার শর্ত এবং বর্তমানে তাদের কাছে থাকা উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুতের ভবিষ্যৎ।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এক বিবৃতিতে জানায়, প্রতিপক্ষ তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত চূড়ান্ত আলোচনা স্থগিত থাকবে। এতে চুক্তির ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন তাৎক্ষণিকভাবে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরবে না। ট্যাংকার জট, মাইন অপসারণ এবং নিয়মিত সরবরাহ পুনরুদ্ধারে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
নিচে চুক্তি ঘিরে প্রধান অনিশ্চয়তাগুলো তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | বর্তমান অবস্থা |
|---|---|
| হরমুজ প্রণালি | বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করার ঘোষণা থাকলেও বাস্তবায়ন অনিশ্চিত |
| পারমাণবিক কর্মসূচি | ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন নিষিদ্ধ রাখার দাবি, যাচাই প্রক্রিয়া অনির্ধারিত |
| ইউরেনিয়াম মজুত | উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ অমীমাংসিত |
| চূড়ান্ত আলোচনা | প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করে স্থগিত বা অগ্রসর হতে পারে |
চুক্তি স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এখনো কয়েক দিন দূরে রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে উভয় পক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো চূড়ান্ত করার সুযোগ রয়েছে, তবে একই সঙ্গে চুক্তি ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়ে গেছে।
এছাড়া ইসরায়েলের ভূমিকাও এই সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। ট্রাম্প এক মন্তব্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লেবাননে সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ চলমান সমঝোতাকে ব্যাহত করতে পারে।
অন্যদিকে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স স্বীকার করেন যে, চলমান উত্তেজনা ও জ্বালানি মূল্যের ওঠানামা সাধারণ আমেরিকানদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
জনমত জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে অসন্তোষ বৃদ্ধি পেয়েছে। একটি জরিপে দেখা যায়, অধিকাংশ আমেরিকান তাঁর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার প্রতি সমর্থন জানাননি এবং ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে মনে করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি মূল্য, মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং আন্তর্জাতিক উত্তেজনা—এই তিনটি বিষয় চুক্তির বাস্তব প্রভাব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।