খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই জুলাই ২০২৬, ৪:৩৯ পিএম

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে আস্থা, তারল্য ও সুশাসনের একাধিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অনেক আমানতকারী দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করছেন, মেয়াদপূর্তির পরও নির্ধারিত অর্থ তুলতে পারছেন না। বিশেষ করে কিছু দুর্বল ব্যাংকে এফডিআর, ডিপিএস বা অন্যান্য আমানত প্রকল্পের অর্থ ফেরত পেতে জটিলতা তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও গ্রাহকদের হাতে নগদ অর্থ তুলে দেওয়ার পরিবর্তে একই অর্থ নতুন করে আমানত হিসেবে রাখার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—যে আয় একজন করদাতা বাস্তবে হাতে পাননি, সেই আয়ের ওপর কর আরোপ কতটা যুক্তিসংগত?
বিষয়টি শুধু কর আইনের ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, করদাতার প্রকৃত সক্ষমতা এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দর্শন। একটি কার্যকর করব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো, কর আরোপ করতে হবে এমন আয়ের ওপর, যা করদাতার বাস্তব আর্থিক সামর্থ্য বৃদ্ধি করে। কিন্তু কোনো অর্থ যদি শুধু হিসাবের খাতায় যোগ হয় এবং বাস্তবে তা ব্যবহার করার সুযোগ না থাকে, তাহলে সেই আয়ের ওপর কর আরোপ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়।
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ২০২০ সালে একটি ডাবল বেনিফিট এফডিআর প্রকল্পে ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলেন। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে মেয়াদ শেষে তাঁর মোট প্রাপ্য দাঁড়াল ১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫০ লাখ টাকা মূলধন এবং ৫০ লাখ টাকা সুদ। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংক সুদের অংশ থেকে ১০ শতাংশ হারে ৫ লাখ টাকা উৎসে কর কেটে নিল।
কিন্তু সমস্যাটি তৈরি হয় তখন, যখন ব্যাংকের তারল্যসংকটের কারণে গ্রাহক ওই অর্থ উত্তোলন করতে পারেন না। কাগজে-কলমে তিনি ৫০ লাখ টাকা সুদ আয় করেছেন, কিন্তু বাস্তবে সেই অর্থ দিয়ে কোনো পণ্য বা সেবা কেনা, বিনিয়োগ করা কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটানোর সুযোগ পাচ্ছেন না।
বর্তমানে কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, মেয়াদপূর্তির পর আমানতের অর্থ ফেরত দেওয়ার পরিবর্তে ব্যাংক গ্রাহককে পুরো অর্থ নতুন আমানত হিসেবে রাখার অনুরোধ করছে। ব্যাংকের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক গ্রাহক বাধ্য হয়ে এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ফলে আয় সৃষ্টি হলেও তার প্রকৃত ব্যবহার বা ভোগের অধিকার স্থগিত থাকছে।
এ অবস্থায় আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় নতুন জটিলতা দেখা দেয়। উৎসে কর কাটার পরও যদি করদাতার মোট করযোগ্য আয় অনুযায়ী অতিরিক্ত কর দিতে হয়, তাহলে তিনি এমন একটি আয়ের জন্য কর পরিশোধ করছেন, যার অর্থনৈতিক সুবিধা এখনো তাঁর হাতে আসেনি।
বর্তমান আয়কর কাঠামোতে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানত থেকে পাওয়া সুদ ও মুনাফা ‘আর্থিক পরিসম্পদ থেকে আয়’ হিসেবে বিবেচিত হয়। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ৬২ ধারায় এ ধরনের আয়ের শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে। একই আইনের ৬৩ ধারায় করযোগ্য আয়ের সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘প্রাপ্ত বা অর্জিত—যেটি আগে’ নীতি অনুসরণ করা হয়।
এর ফলে কোনো ব্যাংক যদি সুদের হিসাব সম্পন্ন করে গ্রাহকের হিসাবে দায় সৃষ্টি করে, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে সেটিকে অর্জিত আয় হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। অর্থাৎ গ্রাহক হাতে টাকা না পেলেও করযোগ্য আয়ের আওতায় তা চলে আসতে পারে।
অন্যদিকে, আইনের ১০২ ধারায় সুদ গ্রাহকের হিসাবে জমা হওয়া বা প্রকৃত অর্থ পরিশোধের সময় উৎসে কর কর্তনের বিধান রয়েছে। পরে ১৭৩ ধারার অধীনে আয়কর রিটার্নে মোট করদায় নির্ধারণ করে উৎসে কর্তিত কর সমন্বয় করা হয়। ফলে বর্তমান ব্যবস্থায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে অর্থ আটকে থাকলেও করের দায় তৈরি হচ্ছে।
ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এই বিতর্ককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি, মূলধন ঘাটতি, তারল্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং দীর্ঘদিনের সুশাসন সংকট দেশের আর্থিক খাতকে চাপের মধ্যে ফেলেছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিস্থিতির পরিবর্তন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উদ্বেগজনক হয়েছে। বিভিন্ন সময় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের হার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
| সময়কাল | খেলাপি ঋণের হার | পরিস্থিতির সংক্ষিপ্ত বিবরণ |
|---|---|---|
| ২০২৩ সালের ডিসেম্বর | ৯ শতাংশ | ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে থাকার তুলনামূলক পর্যায় |
| ২০২৪ সালের ডিসেম্বর | ২০ দশমিক ২০ শতাংশ | এক বছরে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি |
| ২০২৫ সালের ডিসেম্বর | ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ | ব্যাংক খাতে বড় ধরনের চাপের প্রতিফলন |
| ২০২৬ সালের মার্চ | ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ | খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা |
| আমানতকারীদের সমস্যা | অর্থ উত্তোলনে বিলম্ব | কিছু ব্যাংকে তারল্য সংকটের প্রভাব |
| এফডিআর গ্রাহক | মেয়াদ শেষে অর্থপ্রাপ্তিতে জটিলতা | নির্ধারিত সময়ে অর্থ না পাওয়ার অভিযোগ |
| ডিপিএস গ্রাহক | পরিশোধে বিলম্ব | সঞ্চয়কারীদের উদ্বেগ বৃদ্ধি |
| ব্যাংক ব্যবস্থাপনা | তারল্য চাপ | নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা |
| নিয়ন্ত্রক উদ্যোগ | নতুন আইন ও কাঠামো | ব্যাংক পুনর্গঠন ও আমানত সুরক্ষার চেষ্টা |
| করনীতি | স্পষ্টতার প্রয়োজন | অনাদায়ি আয়ের করযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক |
ব্যাংক খাতে আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারও কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন, ২০২৬ প্রণয়নের মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক পুনর্গঠন, বিকল্প ব্যবস্থাপনা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য নিয়ন্ত্রক কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এসব উদ্যোগ থেকে বোঝা যায়, বিশেষ পরিস্থিতিতে আমানতকারীরা অর্থপ্রাপ্তির সমস্যায় পড়তে পারেন—এই বাস্তবতা নীতিনির্ধারণ পর্যায়েও স্বীকৃত। কিন্তু কর ব্যবস্থায় সেই বাস্তবতার প্রতিফলন এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা বা নিয়ন্ত্রক সীমাবদ্ধতার কারণে আটকে থাকা সুদকে সাধারণ আয়ের মতো বিবেচনা করার আগে বিষয়টি নতুনভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কারণ কর আরোপের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত করদাতার প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে রাজস্ব সংগ্রহ করা।
শুধু হিসাবের খাতায় কোনো অর্থ যুক্ত হলেই তা সবসময় একজন ব্যক্তির আর্থিক সামর্থ্য বাড়ায় না। বিশেষ করে যখন অর্থ আটকে থাকার কারণ গ্রাহকের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নয়, বরং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকট।
এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে দেশের সঞ্চয় সংস্কৃতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। একজন নাগরিক যদি দেখেন, ব্যাংকে রাখা অর্থ প্রয়োজনের সময় পাওয়া যাচ্ছে না, কিন্তু সেই অর্থ থেকে হিসাব করা আয়ের ওপর কর দিতে হচ্ছে, তাহলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাঁর আস্থা কমে যেতে পারে।
নীতিগতভাবে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে—
| বিষয় | সম্ভাব্য উদ্যোগ |
|---|---|
| অনাদায়ি সুদের করযোগ্যতা | প্রকৃত অর্থপ্রাপ্তির আগে কর স্থগিতের ব্যবস্থা |
| আয়কর আইন | বিশেষ পরিস্থিতির জন্য পৃথক বিধান সংযোজন |
| উৎসে কর কর্তন | প্রকৃত অর্থ পরিশোধের সঙ্গে কর কর্তনের সম্পর্ক স্থাপন |
| অতিরিক্ত করের চাপ | কর স্থগিত বা কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ |
| দুর্বল ব্যাংকের আমানতকারী | বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু |
| কর নির্ধারণ | বাস্তব আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন |
| ব্যাংকিং আস্থা | সঞ্চয়কারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ |
| নিয়ন্ত্রক সমন্বয় | কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও রাজস্ব কর্তৃপক্ষের যৌথ নীতি |
| কর প্রশাসন | অনাদায়ি আয়ের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা |
| দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার | কর ও ব্যাংকিং নীতির মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা |
জাতীয় রাজস্ব সংগ্রহ রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অপরিহার্য। তবে সেই রাজস্ব এমন আয়ের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়, যা করদাতা এখনো বাস্তবে ব্যবহার করতে পারেননি। একটি আধুনিক করব্যবস্থা শুধু আইন প্রয়োগের বিষয় নয়; এটি ন্যায়বিচার, বাস্তবতা এবং জনগণের আস্থার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশ যখন ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে, তখন করনীতিকেও পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। আমানতকারীর অধিকার এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব স্বার্থ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হতে পারে ভবিষ্যতের একটি টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থার ভিত্তি।
মন্তব্য