চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানার হামজারবাগ এলাকায় এক প্রবাসী ব্যবসায়ীর বহুতল ভবনে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে হামলা ও গুলির ঘটনা ঘটেছে। ৫০ লাখ টাকা চাঁদা পরিশোধ না করার জেরে দুষ্কৃতকারীরা এই হামলা চালায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সোমবার রাত এগারোটার দিকে ঘটা এই আকস্মিক সশস্ত্র হামলায় পুরো এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার পর থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে।
আক্রান্ত ওই ভবনটির নাম রুনা টাওয়ার। ১১ তলা বিশিষ্ট এই ভবনের মালিক মোহাম্মদ ইউসুফ। তাঁর দুই ছেলে প্রবাসী ব্যবসায়ী এবং গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায়। ভবন মালিক মোহাম্মদ ইউসুফের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি সূত্রও রয়েছে। তিনি নিষিদ্ধঘোষিত স্বেচ্ছাসেবক লীগ চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান আজিজের শ্বশুর। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঠিক দুই দিন পর গ্রেপ্তার হয়ে আজিজ বর্তমানে কারাগারেই বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও ভবনটির নিরাপত্তাকর্মী মো. আলমগীর জানান, সোমবার রাতে এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। এই সুযোগে হঠাৎ প্যান্ট ও শার্ট পরিহিত দুই যুবক এসে তাঁকে গেটের ভেতর নিরাপদ দূরত্বে চলে যেতে বাধ্য করেন এবং প্রধান ফটকটি বন্ধ করে দিতে বলেন। এর পরপরই দুষ্কৃতকারীরা গেট লক্ষ্য করে পরপর দুটি গুলি ছুড়ে শান্তভাবে হেঁটেই এলাকা ত্যাগ করে। গুলির বিকট শব্দে মুহূর্তের মধ্যে আশপাশের লোকজন আতঙ্কিত হয়ে জড়ো হন। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে।
চাঁদা দাবির ভয়াবহতার পেছনের চিত্র তুলে ধরে ভবন মালিক মোহাম্মদ ইউসুফ জানান, সোমবার দুপুর বারোটার দিকে একটি বিদেশি নম্বর থেকে তাঁর ছেলে শওকতের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে একটি ভয়েস বার্তা পাঠানো হয়। মাত্র এক ঘণ্টা সময়সীমা বেঁধে দিয়ে ওই বার্তায় বলা হয়, ইউসুফের ছেলেমেয়েরা কোথায় কী করেন, তাঁদের জীবনবৃত্তান্ত এবং দেশের কোথায় কোথায় বাড়ি রয়েছে—সবকিছুই অপরাধীদের নখদর্পণে রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বড় ভাইয়ের কথামতো অবিলম্বে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা না দিলে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়। ভবনের পাশের এক দোকানদার জানান, দোকানের ভেতরে থাকা অবস্থায় হঠাৎ গুলির শব্দ শুনে বাইরে এসে দেখেন দুজন যুবক দ্রুত দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে।
পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহেদুল ইসলাম জানান, হামজারবাগ এলাকায় চাঁদার দাবিতে একটি বহুতল ভবনের মূল ফটক লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার সত্যতা মিলেছে। কারা এই সশস্ত্র ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত, তাঁদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। তবে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এ ঘটনায় থানায় কোনো নিয়মিত মামলা দায়ের হয়নি।
চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এর আগে গত ১৩ জুলাই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বড় দিঘিরপাড় এলাকায় ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিনের নির্মাণাধীন ভবনে ২০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে কুখ্যাত সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমনের অনুসারীদের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনার পর মামলা দায়ের হলে আরও বাড়িয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। ঠিক একইভাবে গত ১৩ জুন নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোডে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ডিডিএনে বিশাল অঙ্কের চাঁদাবাজির দাবিতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এসব লাগাতার ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করে অবিলম্বে চাঁদাবাজি বন্ধ এবং ইমনকে গ্রেপ্তারের জোরালো দাবি জানিয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মোবারক হোসেন ইমন চাঁদাবাজিসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে গত ২৯ জুলাই যশোর সীমান্ত এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং বর্তমানে তিনি পুলিশ রিমান্ডে রয়েছেন। বন্দরনগরীতে এই ধারাবাহিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরও কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী সমাজ।
মন্তব্য