খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ই আগস্ট ২০২৬, ৪:৫১ পিএম

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ আবারও ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সীমা ছাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম৬ হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী, গত সোমবার (১০ আগস্ট) দেশের গ্রস বা মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২.১৫ বিলিয়ন ডলারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য থেকে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
দীর্ঘ সময় পর রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন ডলারের ওপরে ওঠাকে দেশের বৈদেশিক খাতের জন্য স্বস্তিদায়ক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ একটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত তার আমদানি দায় পরিশোধের সক্ষমতা, বৈদেশিক লেনদেন পরিচালনা এবং মুদ্রাবাজারে প্রয়োজন অনুযায়ী ডলার সরবরাহের সামর্থ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হয়েছিল মূলত বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যহীনতা, আমদানি ব্যয় এবং বৈদেশিক লেনদেনের বিভিন্ন চাপের কারণে। সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় রিজার্ভেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ হিসাবে এক দিনের ব্যবধানে মোট রিজার্ভ আরও কিছুটা বেড়েছে, যা সামগ্রিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আইএমএফের বিপিএম৬ বা ‘ব্যালান্স অব পেমেন্টস ম্যানুয়াল, ষষ্ঠ সংস্করণ’ অনুসরণ করে রিজার্ভের একটি হিসাব প্রকাশ করে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই পদ্ধতির মাধ্যমে একটি দেশের বৈদেশিক সম্পদ ও আন্তর্জাতিক লেনদেনের অবস্থান তুলনামূলকভাবে কাঠামোবদ্ধভাবে পরিমাপ করা হয়। ফলে রিজার্ভের অবস্থান বোঝার ক্ষেত্রে বিপিএম৬ হিসাবটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
রিজার্ভ বাড়ার পেছনে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ, রপ্তানি আয় এবং অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রবাহ শক্তিশালী থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। একই সময়ে আমদানি ব্যয় ও অন্যান্য বৈদেশিক পরিশোধ নিয়ন্ত্রিত থাকলে রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
রিজার্ভের বর্তমান অবস্থান মুদ্রাবাজারের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। বৈদেশিক মুদ্রার মজুত তুলনামূলক শক্তিশালী থাকলে আমদানিকারকদের প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহে চাপ কিছুটা কমে। একই সঙ্গে বৈদেশিক লেনদেনে আকস্মিক চাপ দেখা দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা ব্যবস্থাও থাকে।
তবে রিজার্ভের একটি নির্দিষ্ট দিনের পরিমাণ দিয়ে পুরো বৈদেশিক খাতের স্বাস্থ্য বিচার করা যায় না। রিজার্ভ কতটা টেকসইভাবে বাড়ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে রেমিট্যান্সের প্রবাহ, রপ্তানি আয়, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ ও ঋণের কিস্তি পরিশোধসহ বিভিন্ন সূচকের দিকে নজর রাখতে হয়। বৈদেশিক মুদ্রার আয় যদি ধারাবাহিকভাবে ব্যয়ের তুলনায় বেশি থাকে, তাহলে রিজার্ভ বৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নীতিগত উদ্যোগগুলোর একটি বড় লক্ষ্যও ছিল বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং ডলার সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। রিজার্ভের সর্বশেষ অবস্থান সেই প্রচেষ্টার একটি ইতিবাচক প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে, রিজার্ভের পরিমাণ বাড়া নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। তবে এই প্রবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎসগুলোকে শক্তিশালী রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের চাপ কমানো জরুরি। বিশেষ করে রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি রিজার্ভ ধরে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে ৩২.১৫ বিলিয়ন ডলারের গ্রস রিজার্ভ বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতে সাম্প্রতিক উন্নতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এখন নজর থাকবে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কতটা স্থায়ী হয় এবং আগামী মাসগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার আয়-ব্যয় ও মুদ্রাবাজারের পরিস্থিতি কীভাবে পরিবর্তিত হয়। রিজার্ভের পরিমাণের পাশাপাশি এর স্থায়িত্বই বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
মন্তব্য