নওগাঁর মান্দা উপজেলায় অভিনব কায়দায় হানিট্র্যাপ বা প্রেমের ফাঁদে ফেলে স্থানীয় এলজিইডির এক কার্য সহকারীকে জিম্মি করার চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। ওই কর্মকর্তার আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করে তার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে এক নারীসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রোববার (৯ আগস্ট) দিনভর অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয় এবং পরদিন সোমবার তাদের আদালতের মাধ্যমে নওগাঁ কারাগারে পাঠানো হয়।
ভুক্তভোগী সরকারি কর্মকর্তার দায়ের করা এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে মান্দার ঐতিহাসিক কুসুম্বা মসজিদের কাছাকাছি এলাকা থেকে কয়েকজন ব্যক্তি তাকে ডেকে নিয়ে যান। চা খাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে তাকে স্থানীয় একটি টিনশেডের ঘরের ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। সেখানে চা ও সিগারেট খাওয়ার পর থেকেই ওই সরকারি কর্মকর্তার মাথা ঘামতে শুরু করে, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে তাকে চেতনানাশক কিছু খাওয়ানো হয়েছিল।
এরপর দ্রুত তাকে পাশের একটি কক্ষে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চক্রের এক নারী সদস্য তাকে জোরপূর্বক জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করেন এবং অন্য এক ব্যক্তি সেই মুহূর্তটি মুঠোফোনে ভিডিও রেকর্ড করতে থাকেন। ভুক্তভোগী ব্যক্তি এই অনৈতিক কাজের প্রতিবাদ করলে অভিযুক্তরা তার ওপর চড়াও হন এবং তাকে বেধড়ক মারধর করেন। একপর্যায়ে তার গায়ে থাকা পোশাক জোর করে খুলে রেখে অত্যন্ত আপত্তিকর অবস্থায় আরও ভিডিও ধারণ করা হয়।
পরবর্তীতে এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তার কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। এখানেই শেষ নয়, চক্রের সদস্যরা তার মানিব্যাগ ও পকেট হাতড়ে জোরপূর্বক নগদ ১১ হাজার ৯০০ টাকা ছিনিয়ে নেন। পাশাপাশি আরও ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে আদায়ের উদ্দেশ্যে তার স্বাক্ষর করা একটি চেক বইয়ে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা লিখে নেন। এছাড়া আরও একটি চেকের পাতায় টাকার ঘর ফাঁকা রেখে তার স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এমনকি চেকবইয়ের অবশিষ্ট পাতা এবং তিনটি নন-জুডিসিয়াল ফাঁকা স্ট্যাম্পেও জোরপূর্বক তার স্বাক্ষর ও টিপসই নেওয়া হয়।
পরদিন রোববার চক্রের সদস্যরা সেই চেক দিয়ে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা তোলার জন্য মান্দার সতিহাট এলাকার অগ্রণী ব্যাংকের একটি শাখায় যান। এর আগেই ভুক্তভোগী কর্মকর্তা বিষয়টি বুঝতে পেরে ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত বা বন্ধ রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে ব্যর্থ হয়ে অভিযুক্তরা যখন ওই শাখাতেই অবস্থান করছিলেন, তখন খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত সেখানে উপস্থিত হয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে দুজন পালিয়ে গেলেও ঘটনাস্থল থেকেই কনক কুমার ও সাজ্জাদ হোসেন নামের দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় পুলিশ তাদের কাছ থেকে ভুক্তভোগীর স্বাক্ষর করা সেই চেকটি জব্দ করে। পরবর্তীতে ধৃতদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই চক্রের মূল সহযোগী তানজিমা খাতুন নামের এক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোরশেদ আলম গণমাধ্যমকে জানান, এই চক্রটি অত্যন্ত সুকৌশলে দীর্ঘদিন ধরে এই অপরাধ চালিয়ে আসছে। এর আগে গত শুক্রবার (৭ আগস্ট) গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা ও তাদের সহযোগীরা একই কায়দায় ফয়জুল মোল্লা নামের অপর এক ব্যক্তিকে হানিট্র্যাপে ফেলে জিম্মি করেছিলেন। সে সময় তার কাছ থেকে জোরপূর্বক ৬০ হাজার টাকা এবং একটি দামি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। এই ঘটনায় ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে মান্দা থানায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, পলাতক অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
মন্তব্য