জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ই আগস্ট ২০২৬, ৩:১ পিএম

সিলেট বিভাগে হাম ও নিউমোনিয়ার সংক্রমণ পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম-সদৃশ উপসর্গ ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে দুই শিশু ও এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাম সন্দেহে নতুন করে ৯১ জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ফলে বিভাগের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭১ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত বিভাগে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৮২৭ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টাতেই নতুন করে ১৮ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে, যা সংক্রমণের বিস্তার নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া তিনজনের মধ্যে রয়েছেন সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মুরশেদ আলমের আট মাস বয়সী ছেলে আয়ান আহমদ, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার আব্দুল আউয়ালের তিন বছর চার মাস বয়সী ছেলে মো. এহসানুল এবং হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার নেপাল পালের ১৮ বছর বয়সী স্ত্রী বর্ণা রাণী দাস।
আয়ান আহমদের মৃত্যু হয়েছে সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে। মো. এহসানুল মারা গেছে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বর্ণা রাণী দাসের মৃত্যু হয়েছে হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতালে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেট বিভাগের পরিচালক ডা. মাহবুবুল আলম মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের বড় একটি অংশ শিশু। আক্রান্তদের কারও কারও ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিচ্ছে। এসব জটিলতার কারণে বিশেষ করে শিশু রোগীদের অবস্থা দ্রুত গুরুতর হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হওয়া ৯১ রোগীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভর্তি হয়েছে সিলেটের দুটি হাসপাতালে। শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ২৫ জন এবং সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫১ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে। এ ছাড়া গোলাপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিনজন, মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে পাঁচজন এবং সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে সাতজন ভর্তি হয়েছে।
বর্তমানে চিকিৎসাধীন ২৭১ রোগীর মধ্যেও সিলেটের হাসপাতালগুলোতে চাপ বেশি। শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ১২১ জন এবং ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬২ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১১ জন এবং নর্থ ইস্ট হাসপাতালে ছয়জন ভর্তি আছেন। অন্যদিকে গোলাপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঁচজন, বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুজন, সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ৪১ জন, হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে দুজন এবং মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ২১ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন।
চলতি বছরে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যার দিক থেকে সুনামগঞ্জ বিভাগটির সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত জেলা। সেখানে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৩৫১ জন। সিলেট জেলায় এ সংখ্যা ২৭১, হবিগঞ্জে ১০৩ এবং মৌলভীবাজারে ১০২ জন। হবিগঞ্জের নিশ্চিত রোগীদের তালিকায় রুবেলায় আক্রান্ত দুজন রোগীও রয়েছেন।
| জেলা | নিশ্চিত হাম রোগী |
|---|---|
| সিলেট | ২৭১ |
| হবিগঞ্জ | ১০৩ |
| মৌলভীবাজার | ১০২ |
| সুনামগঞ্জ | ৩৫১ |
| মোট | ৮২৭ |
স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে, নতুন করে তিনজনের মৃত্যুর পর চলতি বছরে বিভাগে সন্দেহজনক ও নিশ্চিত হাম-সম্পর্কিত মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ১২৫ জনে দাঁড়িয়েছে। মৃতদের মধ্যে ১২৩ জন শিশু, একজন নারী এবং একজন নার্স রয়েছেন। মৃত্যুর এই পরিসংখ্যানই পরিস্থিতির ভয়াবহতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরছে।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি ও শ্বাসতন্ত্রের নিঃসরণের মাধ্যমে এটি দ্রুত অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু টিকার আওতায় আসেনি বা অসম্পূর্ণ টিকাদান হয়েছে, তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। হাম আক্রান্তদের মধ্যে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, পানিশূন্যতা ও অন্যান্য জটিলতা দেখা দিলে রোগীর অবস্থা গুরুতর হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম নিয়ন্ত্রণে দ্রুত শনাক্তকরণ, আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্যদের থেকে পৃথক রাখা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা সংক্রমণ প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান উপায়। জ্বর, শরীরে র্যাশ, কাশি, সর্দি বা চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
সিলেট বিভাগে বর্তমানে একসঙ্গে দুটি চাপ তৈরি হয়েছে—একদিকে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে সন্দেহভাজন রোগীদের হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যাও ঊর্ধ্বমুখী। এর সঙ্গে নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা যুক্ত হওয়ায় হাসপাতালগুলোতে বিশেষ করে শিশু রোগীদের চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের সময়মতো হাসপাতালে নেওয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মন্তব্য