জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ই আগস্ট ২০২৬, ৩:৩৭ পিএম

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে আধুনিক গদ্যের শক্ত ভিত নির্মাণে যে কজন মনীষী কালজয়ী ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে প্রমথ চৌধুরী অন্যতম। তিনি একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গল্পকার, সম্পাদক, শিক্ষাবিদ এবং বাংলা চলিত গদ্যরীতির প্রধান প্রবর্তক। সাহিত্য জগতে তিনি ‘বীরবল’ ছদ্মনামে অধিক পরিচিত। ছদ্মবেশী এই বীরবলের তীক্ষ্ণ রসবোধ, নির্মোহ বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণ, প্রজ্ঞা এবং ব্যঙ্গরসের সুবিন্যস্ত ধারা বাংলা সাহিত্যকে এক অনন্য উচ্চতায় উন্নীত করেছিল। আধুনিক বিদ্রূপাত্মক ও যুক্তিভিত্তিক প্রবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে তাঁকে বাংলা সাহিত্যের চিরস্মরণীয় পথিকৃৎ হিসেবে গণ্য করা হয়।
Table of Contents
প্রমথ চৌধুরী ১৮৬৮ সালের ৭ আগস্ট যশোর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল পাবনা জেলার চাটমোহর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী হরিপুর গ্রামে। তাঁর পিতা দুর্গাদাস চৌধুরী ছিলেন একজন পরম শিক্ষানুরাগী ও আভিজাত্যপূর্ণ জমিদার। শৈশব থেকেই পারিবারিক সাহিত্যবান্ধব পরিবেশের কল্যাণে প্রমথ চৌধুরীর মাঝে অসাধারণ মেধা, মননশীলতা ও মার্জিত সাহিত্যরুচির বিকাশ ঘটে।
শিক্ষাজীবনে তিনি অনন্য মেধার পরিচয় দেন। কলকাতার বিখ্যাত হেয়ার স্কুল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে বিলেতে গিয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে ব্যারিস্টারি ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশে ফিরে এসে তিনি কলকাতা হাইকোর্টে কিছুদিন আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তবে আইনের গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে পরবর্তীতে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল কলেজে অধ্যাপনায় আত্মনিয়োগ করেন। কর্মজীবনের এক বিশেষ অধ্যায়ে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঠাকুর এস্টেটের ম্যানেজারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও দক্ষতার সঙ্গে পালন করেন।
প্রমথ চৌধুরীর ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবারের নিবিড় যোগসূত্র গড়ে ওঠে। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাইঝি এবং বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সংগীতজ্ঞ ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীকে বিবাহ করেন। সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় এই প্রজ্ঞাবান দম্পতি তাঁদের সময়ে সুধীসমাজে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ও উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
১৯১৪ সালে প্রমথ চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় কালজয়ী সাহিত্য পত্রিকা ‘সবুজপত্র’। এই পত্রিকাটি বাংলা সাহিত্যচর্চায় এক বৈপ্লবিক আন্দোলনের সূচনা করে। তৎকালীন সময়ে সাহিত্য ও প্রাতিষ্ঠানিক রচনায় কৃত্রিম ‘সাধু ভাষা’র একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। প্রমথ চৌধুরী সেই আড়ষ্টতার প্রাচীর ভেঙে সাধারণ মানুষের মুখের সহজ, প্রাত্যহিক ও প্রাঞ্জল ‘চলিত ভাষা’কে সাহিত্যের মূল বাহন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। যুক্তিবাদ, রসবোধ, মানবিকতা ও তীক্ষ্ণ সমাজ-সমালোচনার সমন্বয়ে গঠিত তাঁর প্রাঞ্জল গদ্যরীতি বাংলা ভাষাকে আধুনিক যুগের উপযোগী করে তোলে। পরবর্তীতে তিনি বিখ্যাত ‘বিশ্বভারতী’ পত্রিকাও সফলভাবে সম্পাদনা করেন।
প্রমথ চৌধুরীর সাহিত্যসম্ভার তাঁর গভীর চিন্তাশীলতা ও প্রজ্ঞার পরিচয় বহন করে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর তালিকা নিচে উল্লেখ করা হলো:
প্রবন্ধগ্রন্থ: তেল-নুন-লাকড়ি, বীরবলের হালখাতা, নানাকথা, আমাদের শিক্ষা, রায়তের কথা, এবং নানাচর্চা।
গল্পগ্রন্থ: চার-ইয়ারী কথা, আহুতি, এবং নীললোহিত।
কাব্যগ্রন্থ: সনেট পঞ্চাশৎ এবং পদচারণ।
১৯৪৬ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলা সাহিত্যের এই অমর প্রজ্ঞাবান সাধক পরলোকগমন করেন। তিনি আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থাকলেও তাঁর প্রবর্তিত গতিশীল চলিত গদ্যরীতি, প্রখর যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ব্যতিক্রমী সাহিত্যদর্শন আজও বাংলা ভাষাকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করে চলেছে।
জন্মবার্ষিকীতে বাংলা সাহিত্যের অনন্য ‘বীরবল’ প্রমথ চৌধুরীর প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও প্রগাঢ় প্রণাম।
মন্তব্য