খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই জুলাই ২০২৬, ৬:২৭ পিএম

পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার দমদম বিমানবন্দরসংলগ্ন প্রায় ১৩৬ বছরের পুরোনো বাঁকড়া মসজিদে জুমার নামাজ আদায় ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির ঘোষণা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। শুক্রবার সকাল থেকেই গোটা এলাকায় নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া অবস্থান এবং ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (বিএনএসএস)-এর ১৬৩ ধারা কার্যকর থাকায় মুসল্লি ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির নেতারা নির্ধারিত কর্মসূচি পালন করতে পারেননি।
শুক্রবার ভোর থেকেই দমদম বিমানবন্দরের ৭ নম্বর গেট এবং আশপাশের এলাকায় পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ, কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী, র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (র্যাফ) ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ব্যাপক মোতায়েন করা হয়। নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে জলকামানও প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। পুরো এলাকা ঘিরে রাখায় কোনো ধরনের জমায়েত, মিছিল কিংবা প্রতিবাদ কর্মসূচি গড়ে ওঠেনি।
এর আগে বৃহস্পতিবার বাঁকড়া মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মন্ত্রী এবং জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের রাজ্য সভাপতি সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, শুক্রবার ঐতিহাসিক এই মসজিদে জুমার নামাজ আদায়ের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ দোয়া ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হবে। তবে শুক্রবার বিমানবন্দরের ৭ নম্বর গেট এলাকায় পৌঁছে প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার পর তিনি জানান, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তিনি উপস্থিত সমর্থকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে—এমন কোনো পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী ও তাঁর সঙ্গে থাকা মুসল্লিরা নিকটবর্তী একটি অন্য মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন। একই সময়ে কলকাতার কয়েকটি এলাকায় কিছু মুসল্লিকে হাতে কালো কাপড় বেঁধে নীরবে প্রতিবাদ জানাতে দেখা যায়। এসব কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয় এবং কোথাও বড় ধরনের সংঘর্ষ বা সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি।
বাঁকড়া মসজিদকে ঘিরে বর্তমান বিরোধের সূত্রপাত হয়েছে মসজিদে প্রবেশাধিকার নিয়ে। মসজিদ কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, বিমানবন্দর সম্প্রসারণ বা সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কয়েক দিন আগে থেকেই মসজিদে প্রবেশের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে নিয়মিত জামাতে নামাজ আদায়ও বন্ধ রয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
বৃহস্পতিবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মসজিদ কমিটির সদস্যরা অভিযোগ করেন, গত ১১ জুলাই থেকে মসজিদে যাওয়ার প্রধান পথ ভেতর থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা মৌখিকভাবে জানিয়েছেন যে, বিমানবন্দরসংলগ্ন এই মসজিদে আর নামাজ আদায়ের অনুমতি দেওয়া হবে না। তবে এমন সিদ্ধান্তের পক্ষে তাঁদের কাছে কোনো লিখিত নির্দেশ, সরকারি আদেশ বা আনুষ্ঠানিক নোটিশ উপস্থাপন করা হয়নি বলেও তাঁরা অভিযোগ করেন।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৩৬ বছরের পুরোনো এই উপাসনালয়টি ১৮৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এটি স্থানীয় মুসল্লিদের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত মানুষের ইবাদতের স্থান হিসেবে পরিচিত ছিল। কমিটির দাবি, অবিভক্ত ভারতের সময় বর্তমান বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও অনেকে এই ঐতিহাসিক মসজিদে নামাজ আদায় করতে আসতেন। সেই দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ঐতিহ্য হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং সম্ভাব্য অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতেই ১৬৩ ধারা কার্যকর করা হয়েছে। ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (বিএনএসএস)-এর ১৬৩ ধারা মূলত পূর্বের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারার সমতুল্য। এই ধারার আওতায় কোনো এলাকায় জনসমাবেশ, মিছিল বা এমন কার্যক্রমে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যায়, যা জননিরাপত্তা বা আইনশৃঙ্খলার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত হতে পারে।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে বাঁকড়া মসজিদে পুনরায় নিয়মিত নামাজ আদায়ের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং বিমানবন্দরের ৭ নম্বর গেট দিয়ে প্রবেশের পথ খুলে দেওয়া। তাঁদের বক্তব্য, ধর্মীয় উপাসনার অধিকার সংরক্ষণ এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাটির স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরুদ্ধারে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান হওয়া প্রয়োজন।
শুক্রবারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তর ২৪ পরগনার ওই এলাকায় চাপা উত্তেজনা থাকলেও সার্বিক পরিস্থিতি শান্ত ছিল। নিরাপত্তা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে এবং কোনো বড় ধরনের অঘটন ঘটেনি। এখন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এই বিরোধের সমাধান এবং ঐতিহাসিক বাঁকড়া মসজিদে স্বাভাবিকভাবে ধর্মীয় কার্যক্রম পুনরায় চালুর বিষয়ে স্থানীয়দের প্রত্যাশা আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য