খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই জুলাই ২০২৬, ৫:৪৫ পিএম

নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় মাত্র এক দিনের ব্যবধানে পানিতে ডুবে ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। প্রথমে খালের পানিতে ডুবে চার শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু এবং পরদিন মেঘনা নদীতে গোসল করতে নেমে আরও দুই শিশুর প্রাণহানির ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগও বেড়েছে। একের পর এক এমন দুর্ঘটনা পরিবারগুলোর পাশাপাশি পুরো জনপদকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় উপজেলার চান্দেরকান্দি ইউনিয়নের স্থানীয় ঈদগাহ মাঠে খালে ডুবে মারা যাওয়া চার শিশুর একসঙ্গে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় নিহতদের স্বজন, এলাকাবাসী, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অসংখ্য মানুষ অংশ নেন। পরে বড়কান্দা গ্রামের পাশের সামাজিক কবরস্থানে পাশাপাশি চারটি কবরে তাদের দাফন করা হয়। শৈশব থেকে একসঙ্গে বেড়ে ওঠা চার শিশুর জীবনের শেষ বিদায়ও হলো একই দিনে, একই কবরস্থানে।
নিহত চার শিশু হলো বড়কান্দা গ্রামের শামীম মিয়ার মেয়ে তাবিয়া (১৩), রুবেল মিয়ার মেয়ে আয়েশা (৯), মো. রুবেলের মেয়ে জান্নাত (৮) এবং বিল্লাল মিয়ার মেয়ে সুমাইয়া (১০)। তারা সবাই স্থানীয় গাউসিয়া নুরে মদিনা মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ছিল এবং একই এলাকায় বসবাস করায় প্রতিদিন একসঙ্গে খেলাধুলা ও পড়াশোনা করত।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দুপুরে চার শিশু গ্রামের একটি খালে গোসল করতে নামে। বর্ষার পানিতে খালটি তখন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক গভীর হয়ে উঠেছিল। একপর্যায়ে তারা গভীর পানিতে তলিয়ে যায়। খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা চালালেও শেষ পর্যন্ত তাদের কাউকেই জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
চান্দেরকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেজবাহ উদ্দিন খন্দকার মিতুল জানান, চার শিশুর বাড়ি পাশাপাশি হওয়ায় তারা প্রায় সব সময় একসঙ্গে থাকত। একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করত এবং একসঙ্গে খেলাধুলা করত। এমন হৃদয়বিদারক ঘটনার পর স্থানীয়দের সিদ্ধান্তে একসঙ্গে জানাজা ও পাশাপাশি দাফনের ব্যবস্থা করা হয়।
সরেজমিনে পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিহত চার শিশুর পরিবারই আর্থিকভাবে অসচ্ছল। তাবিয়ার বাবা শামীম মিয়া দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন। আয়েশার বাবা রুবেল মিয়া বিভিন্ন বাজারে কলা বিক্রি করে সংসার চালান। জান্নাতের বাবা মো. রুবেল রাজমিস্ত্রি এবং সুমাইয়ার বাবা বিল্লাল মিয়া শ্রমনির্ভর বিভিন্ন কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, শুকনো মৌসুমে খালটিতে তেমন পানি থাকে না। কিন্তু বর্ষাকালে হঠাৎ করেই পানি বেড়ে খালটি গভীর হয়ে যায়। নিহত চার শিশুর কেউই সাঁতার জানত না। পরিবারের কাউকে কিছু না জানিয়েই তারা গোসল করতে খালে গিয়েছিল।
একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন তাবিয়ার বাবা শামীম মিয়া। তিনি জানান, কাজের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক তখনই ফোনে জানতে পারেন, তার মেয়ে পানিতে ডুবে গেছে। হাসপাতালে গিয়ে মেয়ের নিথর দেহ দেখে তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে তার জীবন যেন শূন্য হয়ে গেছে। কীভাবে মেয়েটি খালে গেল, তা এখনো তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না।
আয়েশার বাবা রুবেল মিয়াও একইভাবে শোকাহত। তিনি বলেন, অভাবের সংসারে মেয়ের হাসি-আনন্দই ছিল পরিবারের সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই চেনা মুখ আর কোনো দিন দেখতে পাবেন না—এই বাস্তবতা তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিহতদের পরিবারের সদস্যরা ময়নাতদন্ত না করার আবেদন করেন। প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে চার শিশুর মরদেহ বিনা ময়নাতদন্তে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। উপজেলা প্রশাসন নিহত প্রত্যেক পরিবারের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ২০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তাও প্রদান করেছে।
রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মজিবুর রহমান বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না থাকায় এবং লিখিত আবেদন পাওয়ার পর আইন অনুযায়ী মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
কিন্তু এই শোক কাটার আগেই শুক্রবার সকালে একই উপজেলায় আবারও ঘটে আরেকটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। বেলা ১১টার দিকে উপজেলার চরাঞ্চলের শ্রীনগর ইউনিয়নের সায়েদাবাদ গ্রামের ভেলুয়ারচর এলাকায় মেঘনা নদীতে গোসল করতে নেমে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়। নিহতরা হলো নুরুজ্জামানের মেয়ে জান্নাতি আক্তার (৮) এবং সাদ্দাম মিয়ার মেয়ে নিপা আক্তার (৭)। এই দুটি মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মাত্র দুই দিনে রায়পুরায় পানিতে ডুবে প্রাণ হারানো শিশুর সংখ্যা দাঁড়ায় ছয়ে।
বর্ষা মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় খাল, নদী, পুকুর ও অন্যান্য জলাশয়ে পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় শিশুদের জন্য ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে যারা সাঁতার জানে না বা প্রাপ্তবয়স্কদের তত্ত্বাবধান ছাড়া জলাশয়ের কাছে যায়, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। স্থানীয়দের মতে, শিশুদের একা জলাশয়ের আশপাশে যেতে না দেওয়া, পরিবারের সদস্যদের বাড়তি নজরদারি এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক উদ্যোগ বাড়ানো গেলে এমন অনেক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এক দিনের ব্যবধানে একই উপজেলায় ছয় শিশুর মৃত্যু শুধু কয়েকটি পরিবারের নয়, পুরো এলাকার মানুষের হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। স্বজনদের কান্না আর শোকাহত মানুষের দীর্ঘশ্বাস মনে করিয়ে দিচ্ছে, বর্ষাকালে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ ও প্রশাসনের সম্মিলিত উদ্যোগের বিকল্প নেই।
মন্তব্য