খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই জুলাই ২০২৬, ৫:৩২ পিএম

বগুড়ার ধুনট উপজেলায় ২০ বছর বয়সী গৃহবধূ নাম্মি আকতার নিপার রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্বামীর বাড়ির বারান্দা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, মরদেহের পাশেই তিন মাস বয়সী ছেলে নাহিদকে কান্নারত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। ঘটনাটিকে ঘিরে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ঘটনার পর স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির কয়েকজন সদস্যের বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার বিষয়টি তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার আগে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সন্ধ্যায় ধুনট উপজেলার নিমগাছি ইউনিয়নের শিয়ালি গ্রামের ফোরহাদ মোল্লার বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের দিকে একটি শিশুর কান্নার শব্দ দীর্ঘ সময় ধরে শোনা গেলে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হয়। পরে তারা বাড়ির বারান্দায় গিয়ে দেখতে পান, নিপা নিথর হয়ে পড়ে আছেন এবং তার পাশেই অসহায় অবস্থায় কাঁদছে ছোট্ট ছেলে নাহিদ। সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি নিহতের স্বজনদের জানানো হয়।
খবর পেয়ে নিপার মা-বাবা ও পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তারা প্রথমে শিশুটিকে নিরাপদে সরিয়ে নেন। পরে ধুনট থানা পুলিশকে খবর দেওয়া হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ উদ্ধার করে। শুক্রবার (১৭ জুলাই) সকালে মরদেহ বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয় ময়নাতদন্তের জন্য।
নিহত নাম্মি আকতার নিপা বগুড়ার গাবতলী উপজেলার নশিপুর ইউনিয়নের বড়ইটালী গ্রামের লাল মিয়া প্রামাণিকের মেয়ে। প্রায় তিন বছর আগে ধুনট উপজেলার শিয়ালি গ্রামের বাহাদুর মোল্লার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। কয়েক মাস আগেই তাদের সংসারে নাহিদ নামে একটি ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। পরিবারের সদস্যদের আশা ছিল, নতুন সন্তানের আগমনে দাম্পত্য জীবনের টানাপোড়েন কমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে স্বজনদের দাবি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বিয়ের পর থেকেই আর্থিক সংকট, সংসারের নানা বিষয় এবং পারিবারিক মতবিরোধকে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই বিরোধ দেখা দিত। প্রতিবেশীদের অনেকেই জানিয়েছেন, গত কয়েক মাস ধরে তাদের সম্পর্কের অবনতি হচ্ছিল এবং মাঝেমধ্যেই পারিবারিক কলহের ঘটনা ঘটত। তবে এসব বিরোধের প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছে পুলিশ।
ঘটনার আগের দিন বুধবার (১৫ জুলাই) সকাল ৮টার দিকে বাহাদুর মোল্লা স্ত্রী ও শিশুসন্তানকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি বড়ইটালী গ্রামে যান। সেখানে স্ত্রী ও সন্তানকে রেখে তিনি নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন। পরদিন বৃহস্পতিবার দুপুরে আবার শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে বিকেল ৫টার দিকে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে নিজের বাড়িতে ফেরেন। এর কয়েক ঘণ্টা পরই ঘটে এই মর্মান্তিক ঘটনা।
স্থানীয়দের দাবি, বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ৮টার দিকে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, নিপা ঘরের তিরের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সময়ে প্রতিবেশীরা আরও জানান, স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা বাড়িতে নেই এবং তিন মাস বয়সী শিশুটিকে মায়ের মরদেহের পাশেই রেখে চলে গেছেন। রাত ১০টার দিকে নিহতের স্বজনরা সেখানে পৌঁছে শিশুটিকে উদ্ধার করেন। পরে পুলিশ এসে মরদেহ জব্দ করে প্রয়োজনীয় আইনি কার্যক্রম সম্পন্ন করে।
এ ঘটনায় নিহতের মা জেলেখা বেগম ধুনট থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে নিপার শরীরে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, নিহতের স্বামী পেশায় একজন অটোরিকশাচালক এবং পারিবারিক কলহের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনার আগে ও পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গতিবিধি, পারিবারিক সম্পর্ক এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্তও যাচাই করা হচ্ছে।
ধুনট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুল ইসলাম জানান, ঘটনার পর থেকেই নিহতের স্বামীসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্য বাড়িতে অনুপস্থিত। তাদের অবস্থান শনাক্ত করতে পুলিশ কাজ করছে। তিনি বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। তদন্তে যদি আত্মহত্যার প্ররোচনা, হত্যাকাণ্ড বা অন্য কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ঘটনা স্থানীয় মানুষের মধ্যে গভীর শোক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে মায়ের মরদেহের পাশে তিন মাস বয়সী এক শিশুর অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকার দৃশ্য অনেককেই আবেগাপ্লুত করেছে। একই সঙ্গে ঘটনাটি পারিবারিক সহিংসতা, দাম্পত্য কলহ এবং সংকটাপন্ন পরিবারগুলোর মানসিক ও সামাজিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে মৃত্যুর কারণ নিয়ে কোনো ধরনের অনুমান বা গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য, ময়নাতদন্তের ফলাফল এবং তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
মন্তব্য