খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই জুলাই ২০২৬, ৪:১০ পিএম

নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার একটি বিলে গোসল করতে নেমে পানিতে ডুবে দুই শিশু শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (১৭ জুলাই) সকালে উপজেলার শ্রীনগর ইউনিয়নের ভেলুয়ারচর গ্রামের নামারচর বিলে ঘটে যাওয়া এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের আহাজারি আর প্রতিবেশীদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে গ্রামের পরিবেশ।
নিহত দুই শিশু হলো ভেলুয়ারচর গ্রামের সাদ্দাম হোসেনের সাত বছর বয়সী মেয়ে নিপা এবং একই গ্রামের নূরুজ্জামানের আট বছর বয়সী মেয়ে জান্নাতি। তারা দুজনই ভেলুয়ারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। অল্প বয়সেই তাদের এমন করুণ মৃত্যু পরিবার, সহপাঠী, শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের গভীরভাবে শোকাহত করেছে।
পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল প্রায় ১০টার দিকে নিপা, জান্নাতিসহ কয়েকজন শিশু নামারচর বিলে গোসল করতে যায়। গোসলের পাশাপাশি তারা পানিতে খেলাধুলাও করছিল। একপর্যায়ে অসাবধানতাবশত নিপা ও জান্নাতি পানির গভীরে চলে গিয়ে তলিয়ে যায়। তাদের সঙ্গে থাকা অন্য শিশুরা বিষয়টি টের পেয়ে চিৎকার শুরু করলে আশপাশের লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা কোনো সময় নষ্ট না করে পানিতে নেমে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। কিছু সময় খোঁজাখুঁজির পর দুই শিশুকে পানির নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়। পরে দ্রুত রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের পরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে আনার আগেই তাদের মৃত্যু হয়েছিল।
রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. শীলা জানান, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ভেলুয়ারচর এলাকা থেকে দুই শিশুকে হাসপাতালে আনা হয়। হাসপাতালে পৌঁছানোর সময় তাদের শরীরে জীবনের কোনো লক্ষণ ছিল না। প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর নিশ্চিত হওয়া যায়, হাসপাতালে আনার আগেই তাদের মৃত্যু হয়েছে। ফলে চিকিৎসকদের আর কিছুই করার সুযোগ ছিল না।
ঘটনার বিষয়ে রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মজিবুর রহমান বলেন, পুলিশ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। ঘটনার সার্বিক দিকও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, গ্রামীণ এলাকায় খাল, বিল, পুকুর ও অন্যান্য জলাশয় শিশুদের জন্য বরাবরই ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পানি বেড়ে যাওয়ায় জলাশয়ের গভীরতা ও স্রোত সম্পর্কে শিশুদের ধারণা থাকে না। ফলে খেলতে খেলতে বা গোসলের সময় মুহূর্তের মধ্যেই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বড়দের তত্ত্বাবধান ছাড়া শিশুদের জলাশয়ের কাছে যেতে দেওয়া হলে এমন ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
শিশু নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে অভিভাবকদের সচেতন থাকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের কখনোই একা পুকুর, বিল বা নদীর ধারে যেতে দেওয়া উচিত নয়। গোসল বা খেলাধুলার সময় অবশ্যই কোনো দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির উপস্থিতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয়গুলো চিহ্নিত করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শিশুদের নিরাপত্তা বিষয়ে নিয়মিত সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করলে এ ধরনের দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
এদিকে দুই শিশুর মৃত্যুতে ভেলুয়ারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে। সহপাঠীরা তাদের আকস্মিক মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না। বিদ্যালয়ের শিক্ষক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গ্রামবাসী নিহত দুই পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।
নিপা ও জান্নাতির অকাল মৃত্যু শুধু দুটি পরিবারের নয়, পুরো এলাকার জন্যই এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়রা মনে করছেন, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। একই সঙ্গে সবাইকে আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
মন্তব্য