খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ই জুলাই ২০২৬, ৭:১৯ পিএম

দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিগত ছয় মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সংস্থাটি জানিয়েছে, এই সময়ে মব-সহিংসতা ও গণপিটুনির মতো ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বুধবার (১৫ জুলাই) প্রকাশিত এই অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে দেশে ২৬১টি মব-সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে, যাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৩৩ জন। এসব ঘটনায় গুরুতর জখম ও আহত হয়েছেন আরও ২৫৬ জন।
বিগত বছরের তুলনায় এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অপরাধের এই প্রবণতা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে এ ধরনের ১৪১টি ঘটনায় ৬৭ জন নিহত এবং ১১৯ জন আহত হয়েছিলেন। দেশের ১৬টি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, মাঠ পর্যায় থেকে সংগৃহীত নিজস্ব তথ্য এবং বিশেষ অনুসন্ধান বা ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে এইচআরএসএস।
সংস্থাটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে জনতা মিলে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা বাড়ছে। মূলত চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের সন্দেহে যেমন পিটিয়ে মারার ঘটনা ঘটছে, তেমনি ব্যক্তিগত বা দলীয় বাকবিতণ্ডা, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং ধর্মীয় অবমাননার মতো অভিযোগ তুলেও মব-সহিংসতা উসকে দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিবেদনে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর অন্তত ৫০টি হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এসব হামলায় ৫৬ জন ব্যক্তি আহত হয়েছেন। একই সাথে ১৯টি উপাসনালয় বা মন্দির, ১৫টি প্রতিমা এবং ৪৩টি বসতবাড়িতে ভাঙচুর ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া জমি দখলের ঘটনা ঘটেছে ৪টি। এর বিপরীতে গত ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছিল ১০টি, যাতে ৪ জন আহত হন এবং ১টি মন্দির, ১১টি প্রতিমা ও ১৮টি বাড়িতে হামলার নজির ছিল।
একই সাথে দেশের শ্রম খাতের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কিছু নেতিবাচক তথ্য সামনে এনেছে সংগঠনটি। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে দেশজুড়ে ৩৩১টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৭৪ জন শ্রমিক নিহত এবং ১ হাজার ৩ জন আহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে শ্রমিক নির্যাতনের ১১২টি ঘটনায় ৫৯ জন নিহত এবং ৭২০ জন আহত হয়েছিলেন।
এর বাইরেও কর্মক্ষেত্রে অনিরাপদ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় পড়ে ২১৬ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যাটি ছিল মাত্র ৪৩। অন্যদিকে, বকেয়া বেতন ও ভাতার দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন ২৬ জন শ্রমিক। গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, ছয় মাসে ২ জন গৃহকর্মী নিহত ও ৪ জন আহত হয়েছেন, পাশাপাশি আরও ২ জন গৃহকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, মানবাধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। এর পাশাপাশি দেশের সচেতন নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনকে এই সহিংস প্রবণতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
মন্তব্য