খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ই জুলাই ২০২৬, ১০:১ পিএম

ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত ছবি ও কনটেন্টের গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র আপত্তির মুখে অবশেষে নতি স্বীকার করল ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা। ইনস্টাগ্রামে থাকা সাধারণ ব্যবহারকারীদের প্রকাশ্য (পাবলিক) ছবির ওপর ভিত্তি করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে নতুন ছবি বানানোর একটি বিশেষ ফিচার চালু করেছিল এই সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট। তবে এটি উন্মোচনের পরপরই শুরু হয় তুমুল বিতর্ক। তীব্র প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত বিতর্কিত এই এআই ফিচারটি পুরোপুরি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মেটা।
মেটা এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই প্রযুক্তিটির উদ্দেশ্য ছিল ব্যবহারকারীদের সৃজনশীলতার পরিধিকে আরও বাড়িয়ে দেওয়া। তবে এটি যেভাবে কাজ করছিল, তা সাধারণ ব্যবহারকারীদের প্রত্যাশা ও স্বস্তির জায়গা পূরণ করতে পারেনি। মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তাই বিতর্কিত এই এআই পরীক্ষাটি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি মেটা তাদের সবচেয়ে আধুনিক ও শক্তিশালী এআই ইমেজ জেনারেশন মডেল ‘মিউজ’ (Muse) বিশ্বজুড়ে উন্মুক্ত করে। এই টুলের মূল কাজ ছিল লিখিত নির্দেশের (টেক্সট প্রম্পট) সাহায্যে যেকোনো ছবি তৈরি করা। তবে এর পাশাপাশি মেটা একটি নতুন পরীক্ষামূলক ফিচার এতে যুক্ত করে। এই ফিচারের অধীনে নির্দিষ্ট কিছু ব্যবহারকারী যেকোনো উন্মুক্ত বা পাবলিক ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের ছবির ওপর ভিত্তি করে এআই-সম্পাদিত সম্পূর্ণ নতুন ছবি তৈরি করার সুযোগ পাচ্ছিলেন। মেটার পরিকল্পনা ছিল, পরীক্ষামূলক ধাপ সফল হলে পর্যায়ক্রমে সব ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীর জন্যই এই ফিচার চালু করা হবে।
কিন্তু টুলটি উন্মুক্ত করার পরপরই বড় বিপত্তি ঘটে। ব্যবহারকারীরা দেখতে পান যে, মেটা এআই চ্যাটবট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যেকোনো পাবলিক প্রোফাইলের ছবি বা কনটেন্ট মুহূর্তেই শনাক্ত করে ফেলছে। এরপর ব্যবহারকারীর কোনো অনুমতি ছাড়াই সেই ছবি এডিট করে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও কৃত্রিম এক ছবি তৈরি করে দিচ্ছে। এই বিষয়টি প্রযুক্তি বিশ্বে এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের মনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়।
অনুমতি ছাড়া এভাবে ছবি ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসতেই সোচ্চার হন বিশ্বের বড় বড় অভিনেতা, চিত্রশিল্পী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী অভিনয়শিল্পীদের সংগঠন ‘স্যাগ-আফট্রা’ (SAG-AFTRA)। তাঁদের অভিযোগ, এই ফিচারের কারণে যে কারও ছবি বিকৃত করার বা পরিচয় চুরির এক বিপজ্জনক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর ফলে ভুয়া ও আপত্তিকর ছবি (ডিপফেক) তৈরি করে অপরাধমূলক ব্ল্যাকমেইলিংয়ের পথ আরও সহজ হতে পারত।
বিশেষ করে, এমি পুরস্কারজয়ী জনপ্রিয় মার্কিন অভিনেত্রী হ্যানা এইনবাইন্ডার তাঁর অনুসারীদের এই ফিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
“কোনো পূর্ব অনুমতি কিংবা সম্মতি ছাড়াই আমার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে এই ক্ষতিকর ফিচারটি মেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু করে দিয়েছিল, যা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।”
অভিনয়শিল্পীদের অধিকার রক্ষাকারী সংগঠন স্যাগ-আফট্রা এই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিচার চালুর বিষয়টিকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে। তারা বলে, ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত অনুভূতি ও ক্ষতির আশঙ্কা বিবেচনা না করে এমন অনৈতিক ফিচার চাপিয়ে দেওয়া মেটার চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতারই প্রমাণ।
নানা মহলের তীব্র চাপের মুখে মেটা যখন বিতর্কিত ফিচারটি সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয়, তখন স্যাগ-আফট্রা এবং সাধারণ ব্যবহারকারীরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। সংগঠনের এক মুখপাত্র মেটার সিদ্ধান্তকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় জয়।
বর্তমানে বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের পাবলিক কনটেন্ট ব্যবহার করছে। এই চর্চা নিয়ে দিন দিন বৈশ্বিক চাপ বাড়ছে। ব্যবহারকারীদের দাবি এখন অত্যন্ত পরিষ্কার—তাঁদের সম্মতি ছাড়া কোনো এআই টুল যেন তাঁদের ছবি বা কোনো লেখা ব্যবহার করতে না পারে এবং এই নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি ব্যবহারকারীদের হাতেই থাকতে হবে। মেটার সুপারইন্টেলিজেন্স ল্যাবের তৈরি প্রথম বড় এআই টুল ‘মিউজ’-এর বিতর্কিত অংশটি বাতিল করা হলেও, এর অন্যান্য সাধারণ সুবিধাগুলো পর্যায়ক্রমে সবার জন্য সচল রাখবে মেটা।
মন্তব্য