খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ই জুলাই ২০২৬, ১০:৭ পিএম

টাঙ্গাইলের সখিপুরে তৃতীয় শ্রেণির স্কুলছাত্রী সামিয়া আক্তারকে (৯) অপহরণ ও নৃশংসভাবে শ্বাসরোধে হত্যার দায়ে আসামি সাব্বির মিয়াকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। আজ বুধবার (১৫ জুলাই) দুপুরে টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক আ. ন. ম. ইলিয়াস জনাকীর্ণ আদালতে আসামির উপস্থিতিতে এই রায় ঘোষণা করেন। ফুটফুটে একটি শিশুর অকালমৃত্যুর এই ঘটনায় দণ্ডপ্রাপ্ত ঘাতক সাব্বির মিয়া (২১) সখিপুর উপজেলার দাড়িয়াপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেনের ছেলে।
নিহত সামিয়া দাড়িয়াপুর উত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। ২০২৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে প্রতিদিনের মতো বাড়ি থেকে সামান্য দূরে প্রাইভেট পড়তে গিয়েছিল সে। পড়াশোনা শেষে বাড়ি ফেরার পথে ওত পেতে থাকা প্রতিবেশী সাব্বির মিয়া তার পথ আগলে দাঁড়ায়। তাকে একা পেয়ে ফুসলিয়ে অপহরণের পর পাশের একটি নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যায় সাব্বির।
সেখানে সামিয়া নিজেকে বাঁচানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে এবং চিৎকার করতে শুরু করে। ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ঘাতক সাব্বির হিংস্র হয়ে ওঠে এবং সামিয়াকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। এরপর অপরাধ ঢাকতে পাশের একটি ধানখেতের সেচ ড্রেনের কাঁদামাটির নিচে লাশ পুঁতে রেখে বাড়ি ফিরে যায়।
হত্যাকাণ্ডের পর নিজেকে আড়াল করতে এক অভিনব ছক কষে সাব্বির। সে একটি ছদ্মনামীয় ‘ইমো আইডি’ ব্যবহার করে ভয়েস মেসেজের মাধ্যমে সামিয়ার বাবা রনজু মিয়ার কাছে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। মেয়ের নিখোঁজ হওয়া এবং এমন হুমকিতে দিশেহারা বাবা পরদিন ৭ সেপ্টেম্বর সখিপুর থানায় মামলা করেন।
মামলা হওয়ার পরদিন ৮ সেপ্টেম্বর পুলিশ সেই ধানখেতের ড্রেন থেকে কাদা জড়ানো অবস্থায় সামিয়ার রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে। এরপর সখিপুর থানা পুলিশ ও গোয়েন্দারা মাঠে নামেন। তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে ২০২৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ঘাতক সাব্বিরকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর সে নিজের অপরাধ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে চার্জশিট জমা দেন।
টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পিপি অ্যাডভোকেট মো. ওমরাও খান দীপু জানান, রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের সুদীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্যপ্রমাণ শেষে আদালত সাব্বিরকে তার প্রতিটি অপরাধের জন্য আলাদা আলাদা ধারায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়েছেন।
পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের দায়ে: আসামি সাব্বিরকে সরাসরি মৃত্যুদণ্ড এবং ৩০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
জোরপূর্বক অপহরণের দায়ে: তাকে ১৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
মুক্তিপণ আদায়ের জন্য আটকে রাখার দায়ে: যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ৩০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
লাশ গুম ও কেরোসিন ঢেলে আলামত পোড়ানোর দায়ে: আরও ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
আদালতে আসামি পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী (স্টেট ডিফেন্স) অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন। রায়ের পর পরই কঠোর পুলিশি প্রহরায় সাব্বিরকে টাঙ্গাইল জেলা কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। এই রায়ে স্বস্তি প্রকাশ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তা কার্যকরের দাবি জানিয়েছে সামিয়ার পরিবার ও দাড়িয়াপুর গ্রামবাসী।
মন্তব্য