খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ই জুলাই ২০২৬, ৯:৩৫ পিএম

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ সমাগত। সব প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে চলতি বছরের আগস্ট মাসের শেষদিকে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘রূপপুর’ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এই যুগান্তকারী তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি অত্যন্ত আশাবাদের সাথে জানান, প্রথম ইউনিটের সক্ষমতা পর্যায়ক্রমে বাড়িয়ে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই ১,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন এই মেগা প্রকল্পের বাণিজ্যিক উৎপাদনের সুনির্দিষ্ট সময়সূচিও এখন স্পষ্ট। কেন্দ্রটির পরিচালনাকারী সংস্থা নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, প্রথম ইউনিটটি ২০২৭ সালের শুরুতে এবং দ্বিতীয় ইউনিটটি ২০২৮ সালের প্রারম্ভে পুরোদমে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে রূপপুর প্রকল্পের সার্বিক নিরাপত্তা, কারিগরি প্রস্তুতি এবং ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি বা ‘স্পেন্ট ফুয়েল’ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও উদ্বেগ প্রকাশিত হয়েছে। জনমনে তৈরি হওয়া এই সব কৌতূহল ও বিভ্রান্তি দূর করতে এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাছান বিস্তারিত ও তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো একক দেশ বা প্রতিষ্ঠানের তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তে পরিচালিত হচ্ছে না। এটি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ), রাশিয়ার স্বাধীন পরমাণু নিয়ন্ত্রক সংস্থা (Rostechnadzor) এবং বাংলাদেশের নিজস্ব পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়রা) অত্যন্ত কঠোর, বহুমাত্রিক ও নিবিড় নজরদারিতে পরিচালিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি, জার্মানির বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক কারিগরি মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠান (VO Safety) এই প্রকল্পের প্রতিটি স্তরের নিরাপত্তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। ফলে আন্তর্জাতিক মানের সর্বোচ্চ ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় নিশ্চিত করেই এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু করা হচ্ছে।
প্রকল্পের পরিচালন সক্ষমতা ও জনবলের ঘাটতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে যে সংশয় ছিল, তা দৃঢ়ভাবে নাকচ করে দিয়েছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি জানান, এমন একটি জটিল ও সংবেদনশীল প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ গত এক দশক ধরে সুপরিকল্পিতভাবে দক্ষ জনবল তৈরি করেছে।
বিগত ১০ বছরে দেশের শত শত তরুণ প্রকৌশলী, দক্ষ টেকনিশিয়ান ও অপারেটরদের রাশিয়ার বিভিন্ন পারমাণবিক স্থাপনায় পাঠিয়ে আন্তর্জাতিক মানের দীর্ঘমেয়াদি ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে রূপপুরের মাঠপর্যায়ে রুশ বিশেষজ্ঞদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যৌথভাবে কাজ করছেন আমাদের দেশীয় কর্মীরা। এর ফলে এনপিসিবিএল এখন শতভাগ প্রস্তুত ও আন্তর্জাতিক মানের একটি স্বাবলম্বী অপারেটর প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। দেশীয় বিশেষজ্ঞদের এই অর্জিত আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতাই আগামী দিনে কেন্দ্রটি সচল রাখবে।
ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি বা বর্জ্য বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যাবে কি না—এমন একটি বড় খটকা সাধারণ মানুষের মনে ছিল। এই বিষয়ে ড. মো. জাহেদুল হাছান অত্যন্ত জোরালো বার্তা দিয়েছেন। তিনি জানান, রাশিয়ার সাথে ইতিমধ্যে আইনিভাবে ‘স্পেন্ট ফুয়েল টেক ব্যাক’ বা ব্যবহৃত জ্বালানি ফেরত নেওয়ার চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
তিনি এর বৈজ্ঞানিক ও আন্তর্জাতিক প্রটোকল ব্যাখ্যা করে বলেন:
“চুল্লি বা রিঅ্যাক্টর থেকে বর্জ্য বের করেই তা সরাসরি জাহাজে তুলে অন্য দেশে পাঠানো যায় না। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, তেজস্ক্রিয়তা ও তাপ কমানোর জন্য এই স্পেন্ট ফুয়েলকে প্রথমে রূপপুরের নিজস্ব সর্বাধুনিক ‘স্পেন্ট ফুয়েল পুল’-এ নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ডুবিয়ে রাখা ও শীতল করা হবে। এই শীতলীকরণ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ামাত্রই দ্বিপাক্ষিক চুক্তি মেনে বিশেষ সুরক্ষায় তা রাশিয়ায় ফেরত পাঠানো হবে। ফলে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে এই বর্জ্য স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার বা পরিবেশ বিপর্যয়ের কোনো সুযোগই নেই।”
উল্লেখ্য, রূপপুরে রাশিয়ার সর্বাধুনিক ও ‘থ্রি প্লাস জেনারেশন’ প্রযুক্তির অত্যন্ত নিরাপদ ‘ভিভিইআর-১২০০’ (VVER-1200) মডেলের দুটি চুল্লি বা রিঅ্যাক্টর স্থাপনের কাজ এখন চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে। প্রকল্পটির দুটি ইউনিট যখন পুরোদমে চালু হবে, তখন জাতীয় গ্রিডে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট সাশ্রয়ী, কার্বনমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। এটি দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখতে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে।
মন্তব্য