খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই জুলাই ২০২৬, ৩:১০ পিএম

চট্টগ্রামে টানা ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং ভয়াবহ বন্যার প্রভাবে দুর্গত এলাকাগুলোতে সাপের উপদ্রব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্লাবিত জমি, গর্ত ও ঝোপঝাড় পানির নিচে চলে যাওয়ায় বিভিন্ন প্রজাতির সাপ আশ্রয়ের খোঁজে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। এর ফলে বন্যাকবলিত এলাকায় দ্রুত বাড়ছে সাপে কাটার ঘটনা। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত অন্তত ৭৫ জন সাপের কামড়ে আহত হয়েছেন। তবে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত হওয়ায় এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক বিরাজ করছে বাঁশখালীর বিভিন্ন এলাকায়। অনেক বসতবাড়ির আঙিনা, রান্নাঘর, বারান্দা এমনকি ঘরের ভেতরেও সাপ দেখা যাওয়ার অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা। দিনের তুলনায় রাতের বেলায় পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিদ্যুৎবিচ্ছিন্নতা, জলাবদ্ধতা এবং সীমিত চলাচলের সুযোগ মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
বাঁশখালী উপজেলার সরল ইউনিয়নের বাসিন্দা কাদের জানান, বন্যার পানিতে চারপাশ ডুবে যাওয়ায় সাপ প্রায়ই ঘরের আশপাশে চলে আসছে। রাতে স্বাভাবিকভাবে ঘুমানো বা বাইরে বের হওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। আগে কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, পানিবন্দি জীবনের কষ্টের সঙ্গে এখন সাপের ভয়ও যোগ হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা কার্যালয়ের তথ্য বলছে, অতিভারী বৃষ্টি, বন্যা, পাহাড়ধস এবং দেয়ালধস মিলিয়ে নগরসহ রাঙ্গুনিয়া, সীতাকুণ্ড, রাউজান, আনোয়ারা, হাটহাজারী, সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায় মোট ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ছয়জন শিশু, চারজন পুরুষ এবং তিনজন নারী রয়েছেন।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগজনিত বিভিন্ন ঘটনায় মোট ৯০ জন আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে পাহাড়ধসে আহত হয়েছেন দুইজন, দেয়ালধসে দুইজন, সাপে কাটা রোগী ৭৫ জন এবং অন্যান্য ঘটনায় আহত হয়েছেন ১১ জন।
সাপে কাটা রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২২ জন পটিয়া উপজেলার বাসিন্দা। এছাড়া বোয়ালখালীতে ২০ জন, রাউজানে ১৪ জন, হাটহাজারীতে ৮ জন, রাঙ্গুনিয়ায় ৩ জন, সাতকানিয়ায় ৩ জন, চন্দনাইশে ৩ জন এবং লোহাগাড়ায় ২ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানান, দুর্যোগের শুরু থেকে শনিবার পর্যন্ত বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া আহতদের মধ্যে সাপে কাটা রোগীর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। তবে সময়মতো হাসপাতালে আনা এবং অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের কারণে এখন পর্যন্ত কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি।
তিনি বলেন, প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম মজুত রাখা হয়েছে। দুর্গত এলাকায় বিশেষ মেডিকেল টিম নিয়মিত কাজ করছে। এসব দল চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করতে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, খাবার স্যালাইন, প্যারাসিটামল এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ করছে। জরুরি প্রয়োজনে অন্তঃসত্ত্বা নারী, শিশু ও গুরুতর অসুস্থ রোগীদের নৌকাযোগে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় সাতকানিয়া উপজেলার ২৪টি এবং বাঁশখালী উপজেলার ১৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাতকানিয়া, বাঁশখালী ও বোয়ালখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বন্যার পানি প্রবেশ করলেও বর্তমানে সেখানকার পানি নেমে গেছে এবং চিকিৎসাসেবা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ দুর্গত এলাকার মানুষকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে রাতে চলাচলের সময় টর্চ ব্যবহার করা, পানিতে নামার আগে লাঠি দিয়ে জায়গা পরীক্ষা করা, ঘরবাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং সাপে কামড়ালে ঝাড়ফুঁক বা কুসংস্কারের আশ্রয় না নিয়ে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাপে কামড়ানোর পর দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণই প্রাণহানি ও জটিলতা কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
মন্তব্য