খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ই জুলাই ২০২৬, ১০:৫ পিএম

কক্সবাজারে টানা ও অনবরত বর্ষণে বন্যা পরিস্থিতি এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। দিন দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় প্লাবিত এলাকাগুলোর মানুষের দুর্ভোগ এখন চরমে পৌঁছেছে। এই চরম প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে পাহাড়ধস ও বন্যার পানিতে ডুবে জেলায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ জনে।
রোববার (১২ জুলাই) কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান দুর্যোগের এই ভয়াবহ চিত্র ও নিহতের সংখ্যাটি নিশ্চিত করেছেন। প্রশাসন জানিয়েছে, গত এক সপ্তাহে পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে যে ২৮ জন মারা গেছেন, তাদের মধ্যে ১৭ জনই বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক বা রোহিঙ্গা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শনিবার (১১ জুলাই) দিনের বেলা বৃষ্টির বেগ কিছুটা কমে আসায় বন্যার পানি নামতে শুরু করেছিল। এতে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে অনেকে ঘরের দিকে পা বাড়াচ্ছিলেন। তবে সেই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি। শনিবার গভীর রাত থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত জেলাজুড়ে আবারও শুরু হয় তীব্র মুষলধারে বৃষ্টি। ফলে বন্যাকবলিত নিচু এলাকাগুলো নতুন করে প্লাবিত হতে শুরু করেছে।
ঘরের ভেতর পানি ঢুকে পড়ায় দুর্গত মানুষেরা চরম খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েছেন। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে দেখা দিয়েছে পাহাড়ধসের তীব্র ঝুঁকি। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীরা মাইকিং করাসহ নানা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।
দুর্যোগ কবলিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছে। চকরিয়া, রামু, কক্সবাজার সদর ও উখিয়ায় বন্যার্তদের মাঝে খাদ্য ও নগদ অর্থ বিতরণকালে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণের তুলনায় বর্তমানে দেওয়া মানবিক সহায়তা একেবারেই অপ্রতুল। তিনি সরকারি ত্রাণ তৎপরতা আরও জোরদার করার দাবি জানান।
এদিকে, কক্সবাজার সদর আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল রামু, ঈদগাঁও ও সদর এলাকার দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করছেন। পেকুয়াতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষে ছফুয়ানুল করিমের নেতৃত্বে দিন-রাত শুকনো খাবার ও পানি বিতরণ করা হচ্ছে। জেলা ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দও দুর্গতদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছেন।
সবশেষ চব্বিশ ঘণ্টায় জেলায় নতুন করে আরও দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পেকুয়ায় বন্যার পানিতে ডুবে ১৯ মাস বয়সী এক শিশুর এবং কক্সবাজার শহরে পাহাড়ধসে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে।
পেকুয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম জানান, শনিবার রাতে পেকুয়া সদর ইউনিয়নের বলিরপাড়া এলাকায় ১৯ মাস বয়সী শিশু মুশফিকুর রহিম বন্যার পানিতে ডুবে মারা যায়। সে ওই এলাকার প্রবাসী নাছির উদ্দীনের ছেলে। ঘটনার সময় ঘরের ভেতর হাঁটুসমান এবং উঠানে কোমরসমান পানি ছিল। শিশুটির মা যখন ঘরের বাইরে কাজে ব্যস্ত ছিলেন, তখন সবার অগোচরে সে পানিতে পড়ে স্রোতে ভেসে যায়। দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর ঘর থেকে প্রায় দেড়শ ফুট দূরে ভাসমান অবস্থা থেকে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
অন্যদিকে, শনিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে কক্সবাজার সদরের ঝিলংজা ইউনিয়নের পূর্ব কলাতলীর ঝরঝরিপাড়ায় পাহাড়ধসে রোজিনা বেগম (৪০) নামের এক গৃহবধূ মাটিচাপা পড়ে মারা যান। কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসাইন জানান, রাতের খাবার তৈরির জন্য পাহাড়ঘেঁষা রান্নাঘরে থাকার সময় হঠাৎ পাহাড়ের একাংশ ধসে পড়ে ঘরটি চাপা দেয়। ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে। ঘটনার সময় তাঁর স্বামী আব্দুল মজিদ সন্তানদের নিয়ে দোকানে ছিলেন। স্বামী আব্দুল মজিদ আক্ষেপ করে বলেন, পাহাড়ধসের ঝুঁকি থাকায় তিনি স্ত্রীকে বারবার রান্নাঘরে যেতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না।
কক্সবাজার সদরের ইউএনও তাহমিনা আক্তার জানান, টানা বৃষ্টিতে পাহাড়গুলো জরাজীর্ণ ও অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। বারবার মাইকিং করা সত্ত্বেও অনেকে নিজ দায়িত্বে ঝুঁকিপূর্ণ ঘরে ফিরে আসছেন, যা অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ডেকে আনছে। এর আগে গত ৭ জুলাই ঝিলংজার দরিয়ানগর এলাকায় পাহাড়ধসে লিমা আক্তার (২৫) নামের এক নারী মারা যান এবং মেরিন ড্রাইভের হিমছড়ি এলাকায় পাহাড়ধসের কারণে দীর্ঘক্ষণ যান চলাচল ব্যাহত হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তর সতর্ক করে জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আরও কয়েকদিন মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে। ফলে পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি এখনও কাটেনি।
জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান জানান, উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবক দল মাঠপর্যায়ে সার্বক্ষণিক কাজ করছে। পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে চলে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মন্তব্য