খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ই জুলাই ২০২৬, ৪:৫২ পিএম

বাংলাদেশের জন্য নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হচ্ছে আগামীকাল। সংস্থাটির বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিনিধিদল ঢাকা সফরে এসে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় aঅর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকে অংশ নেবে। এই সফরকে বাংলাদেশের আগামী কয়েক বছরের অর্থনৈতিক নীতিপথ এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নের সম্ভাবনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই সফরের মূল লক্ষ্য হলো সরকারের চলমান অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির অগ্রগতি পর্যালোচনা করা, সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন করা এবং নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত প্রস্তুতি যাচাই করা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, আর্থিক খাতের কাঠামোগত সংস্কার এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো আলোচনায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। এসব ক্ষেত্রে সন্তোষজনক অগ্রগতি হলে আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশের জন্য নতুন একটি ঋণ কর্মসূচি চালুর সম্ভাবনা রয়েছে।
সরকার আশা করছে, নতুন কর্মসূচির আওতায় তিন বছরের জন্য প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ পাওয়া যেতে পারে। এই অর্থ দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বৈদেশিক অর্থায়নের চাপ মোকাবিলা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং চলমান অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যেই গত ৯ জুন অর্থমন্ত্রী আইএমএফের কাছে নতুন ঋণ কর্মসূচির আবেদন জানিয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠান।
সরকারের পাঠানো ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আগের ঋণ কর্মসূচি গ্রহণের সময় দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও নীতিগত পরিবেশ বর্তমান পরিস্থিতির তুলনায় ভিন্ন ছিল। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন, রাজনৈতিক অর্থনীতির নতুন বাস্তবতা এবং অভ্যন্তরীণ আর্থিক চাপের কারণে কিছু সংস্কার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তবে সরকার সংস্কার কার্যক্রম থেকে সরে আসতে চায় না; বরং দেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় ধাপে ধাপে সেগুলো বাস্তবায়নের কৌশল অনুসরণ করতে আগ্রহী।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন বৈঠকগুলোতে দেশের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। বিশেষ করে সদ্য ঘোষিত ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিভিন্ন কর ছাড়ের যৌক্তিকতা, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিবন্ধকতা, আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থার সংস্কার, কর-ব্যয় ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব কৌশল নিয়ে আইএমএফ প্রতিনিধিদল বিস্তারিত জানতে চাইবে। রাজস্ব সংগ্রহে ধারাবাহিক ঘাটতি কাটিয়ে কীভাবে করের আওতা বাড়ানো হবে, সেই পরিকল্পনাও আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।
ব্যাংকিং খাতও এই সফরের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়। খেলাপি ঋণ কমানোর কৌশল, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, প্রয়োজন হলে অবসায়ন প্রক্রিয়ার অর্থায়ন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো আইএমএফ নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করবে। আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে এসব সংস্কারের বাস্তব অগ্রগতি কতটা হয়েছে, সেটিও গুরুত্ব পাবে।
এ ছাড়া সরকারি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাপ, বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের নীতি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ব্যয়ের কার্যকারিতা এবং ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচির বাস্তব ফলাফল নিয়েও আলোচনা হবে। সরকার যে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো পরিচালনা করছে, সেগুলো লক্ষ্যভিত্তিকভাবে কতটা কার্যকর হচ্ছে এবং সরকারি অর্থ কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যয় করা হচ্ছে, সে বিষয়েও প্রতিনিধিদল মূল্যায়ন করবে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কতটা বাস্তবসম্মত, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অর্থ কতটা দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন হচ্ছে এবং সরকারি বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক ফল দিচ্ছে কি না—এসব বিষয়ও আলোচনায় গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই রাখতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের গতি ও কার্যকারিতা নিয়েও আইএমএফের মূল্যায়ন থাকবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সফর কেবল একটি নিয়মিত পর্যালোচনা নয়; বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের আস্থা এবং ভবিষ্যৎ বৈদেশিক অর্থায়নের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রতিনিধিদলের মূল্যায়ন ইতিবাচক হলে পরবর্তী পর্যায়ে নতুন ঋণ কর্মসূচির পূর্ণাঙ্গ আলোচনা শুরু হবে। তখন ঋণের চূড়ান্ত পরিমাণ, অর্থ ছাড়ের কিস্তিভিত্তিক সময়সূচি এবং সংস্কারসংক্রান্ত শর্তগুলো নিয়ে বিস্তারিত সমঝোতা হবে।
অন্যদিকে, যদি আইএমএফ মনে করে যে সংস্কার কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি বা নীতিগত অঙ্গীকার বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে, তাহলে নতুন ঋণ কর্মসূচির আলোচনা দীর্ঘায়িত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ঋণ অনুমোদনের আগে আরও কঠোর সংস্কার শর্ত বা অতিরিক্ত নীতিগত পদক্ষেপের বিষয়ও সামনে আসতে পারে। ফলে আগামী কয়েক দিনের বৈঠকগুলো শুধু নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাবনাই নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মন্তব্য