খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫৩ পিএম

ময়মনসিংহ মহানগরীর একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে দীর্ঘ ছয় মাস ধরে বিকৃত যৌন লালসা চরিতার্থ ও অশালীন আচরণের অভিযোগে মাহমুদুল হাসান (৪৫) নামক এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার ময়মনসিংহের একটি আদালত তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ প্রদান করেন। এর আগে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় সিরাজগঞ্জ জেলা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। এই ঘটনাটি ময়মনসিংহের স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও অভিভাবকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের পাশাপাশি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
Table of Contents
গ্রেপ্তারকৃত মাহমুদুল হাসান সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি উপজেলার আজুগড়া দক্ষিণপাড়া গ্রামের মোজাম্মেল হক প্রামাণিকের সন্তান। তিনি জীবিকার সন্ধানে সিরাজগঞ্জ থেকে ময়মনসিংহে এসে নগরীর ছোট বাজার এলাকায় একটি কাপড়ের দোকানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। প্রাত্যহিক কর্মস্থলে যাতায়াতের পথে তিনি নতুনবাজার সংলগ্ন একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের সামনের নির্জন সড়কটিকে নারী শিক্ষার্থীদের উত্যক্ত ও বিকৃত রুচির আচরণ প্রদর্শনের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতেন।
পুলিশি তদন্ত ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, মাহমুদুল হাসান অত্যন্ত সুকৌশলে ও পরিকল্পিতভাবে এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিলেন। প্রতিদিন ভোরবেলা যখন শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের বিশেষ ক্লাস বা কোচিংয়ের উদ্দেশ্যে বের হতো, তখন তিনি সুযোগ বুঝে সেখানে অবস্থান নিতেন। জনমানবশূন্য ভোরের সুযোগ নিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, অশালীন অঙ্গভঙ্গি এবং চরম বিকৃত যৌন আচরণ প্রদর্শন করতেন। এই দীর্ঘ ছয় মাসের উৎপাতে কোমলমতি নারী শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেও ভয়ে বা লোকলজ্জার কারণে অনেকে বিষয়টি গোপন রেখেছিল।
তবে গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবার দুই শিক্ষার্থীকে লক্ষ্য করে একই ধরণের চরম বিকৃত আচরণ করার সময় তা বিদ্যালয়ের প্রবেশপথে স্থাপিত সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরায় স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। ঘটনার পরপরই উপস্থিত শিক্ষক ও কর্মচারীরা ধাওয়া করে তাকে হাতেনাতে আটক করতে সক্ষম হন।
আটকের পর প্রাথমিকভাবে মাহমুদুল হাসানকে স্থানীয়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। তবে সে সময় অভিযুক্তের কর্মস্থল অর্থাৎ ছোট বাজারের বস্ত্রালয়ের মালিকের মধ্যস্থতায় বিষয়টি অনেকটা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। মালিকের প্রতিশ্রুতি এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ না করার লিখিত মুচলেকা গ্রহণ করে তাকে তখন সাময়িকভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু গত মঙ্গলবার উক্ত সিসিটিভি ফুটেজটি কোনোভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে।
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয় এবং নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরণের প্রশ্ন ওঠে। সিসিটিভি ফুটেজে অভিযুক্তের বিকৃত আচরণের ধরন দেখে সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানানোর উপক্রম করেন। বিষয়টি ময়মনসিংহের জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে এলে তারা অবিলম্বে প্রযুক্তির ব্যবহার করে আসামিকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন।
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার সংবাদ পেয়ে মাহমুদুল হাসান ময়মনসিংহে তার কর্মস্থল ও বাসা ত্যাগ করে গা ঢাকা দেন। ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি চৌকস দল নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে আসামির অবস্থান শনাক্ত করে। শেষ পর্যন্ত সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ সূত্রে আরও জানা যায়, মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১০ ধারায় (যৌন নিপীড়ন) একটি মামলা রুজু করা হয়েছে। এই ধারায় মূলত ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো নারীর শ্লীলতাহানি বা যৌন হয়রানিমূলক আচরণের জন্য কঠোর দণ্ডের বিধান রয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে আসামিকে ময়মনসিংহের বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার পর থেকে বিদ্যালয়ের সীমানা এবং সংলগ্ন প্রধান সড়কে নিরাপত্তা ও নজরদারি আগের চেয়ে বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, “আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ভীতিমুক্ত ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। এ ধরণের বিকৃত মানসিকতার অপরাধীদের বিষয়ে পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করবে।”
অভিভাবকরা প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থানে সন্তোষ প্রকাশ করলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রাথমিক পর্যায়ে আসামিকে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায়। তারা মনে করেন, যদি ঘটনার পরপরই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তবে বিষয়টি সামাজিক উদ্বেগের কারণ হতো না। বর্তমানে মাহমুদুল হাসান কারাগারে রয়েছেন এবং মামলার চার্জশিট প্রদানের জন্য তদন্ত কার্যক্রম জোরালোভাবে এগিয়ে চলছে। এই রায় ও গ্রেপ্তারের ঘটনাটি ময়মনসিংহের নারীদের জন্য যাতায়াতের পথকে আরও নিরাপদ করার পথে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।
মন্তব্য