খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ই জুলাই ২০২৬, ১:৪৭ পিএম

বাংলা কবিতার ইতিহাসে আহসান হাবীব এক অনন্য ও কালজয়ী নাম। আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম এই প্রধান পুরুষ ১৯১৭ সালের ২ জানুয়ারি পিরোজপুর জেলার শংকরপাশা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক চমৎকার আবহে বেড়ে ওঠেন। পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক সেই পরিবেশই তাঁর কিশোর মনকে শব্দের জাদুকরী জগতে আকৃষ্ট করে এবং খুব অল্প বয়সেই তিনি লেখালেখির জগতে পা রাখেন। ১৯৩৩ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় পিরোজপুর গভর্নমেন্ট স্কুল ম্যাগাজিনে তাঁর প্রথম কবিতা ‘মায়ের কবর’ প্রকাশিত হয়।
পিরোজপুর গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে ১৯৩৫ সালে কৃতিত্বের সাথে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি বরিশালের ঐতিহ্যবাহী বিএম কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু দারিদ্র্য তাঁর উচ্চশিক্ষার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দেড় বছর পর, ১৯৩৬ সালের শেষার্ধে জীবিকার সন্ধানে মাত্র ১৯ বছর বয়সে তাঁকে তৎকালীন সাংস্কৃতিক রাজধানী কলকাতায় পাড়ি জমাতে হয়।
কলকাতার দিনগুলো তাঁর জন্য ছিল চরম পরীক্ষা ও নির্মম সংগ্রামের। কখনো অনাহারে ফুটপাতে রাত কেটেছে, কখনো আবার ক্ষুধার তাড়নায় রেস্তোরাঁয় ঢুকে খাবার খেয়ে বিল পরিশোধ করতে না পেরে গলার মাফলার জমা রাখার প্রস্তাব দিতে হয়েছে। জীবনের এই কঠিনতম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েও তিনি দমে যাননি, বরং নিজের ভেতরের সৃজনশীল শক্তিকে আরও শাণিত করেছেন।
অবশেষে ১৯৩৭ সালে মাত্র ১৭ টাকা মাসিক বেতনে ‘দৈনিক তকবির’ পত্রিকায় সহসম্পাদক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর সাংবাদিকতা ও কর্মজীবনের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। এটি ছিল তাঁর জীবনসংগ্রামের একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট। পরবর্তীকালে তিনি ‘বুলবুল’, ‘মাসিক সওগাত’ এবং কলকাতা কেন্দ্রের ‘আকাশবাণী’-তে স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৬ সালে দেশভাগের ঠিক আগে তিনি মকবুলা বেগমকে বিয়ে করেন।
দেশভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং এদেশের সংবাদপত্র ও সাহিত্য অঙ্গনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ‘দৈনিক বাংলা’ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কেবল একজন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন না, বরং স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনের এক প্রজ্ঞাবান ও দরদি অভিভাবক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। অসংখ্য তরুণ ও নবীন লেখক তাঁর হাত ধরে সাহিত্যের মূল ধারায় উঠে এসেছেন। তাঁর স্নেহ, নিখুঁত দিকনির্দেশনা ও অকৃত্রিম উৎসাহ বহু লেখককে সাহিত্যচর্চায় আজীবন যুক্ত থাকার প্রেরণা জুগিয়েছে।
কবিতা, উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, শিশুতোষ ছড়াসহ সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই আহসান হাবীবের বিচরণ ছিল স্বচ্ছন্দ। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা প্রায় পঁচিশটি। ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাত্রিশেষ’ তাঁকে পাঠক ও সমালোচকদের কাছে সমাদৃত করে তোলে। এরপর ‘ছায়াহরিণ’, ‘সারা দুপুর’, ‘আশায় বসতি’, ‘মেঘ বলে চৈত্র যাবো’র মতো কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ উপহার দেন তিনি। বড়দের পাশাপাশি শিশুদের জন্যও তিনি চমৎকার সব ছড়া ও কবিতা লিখেছেন, যার মধ্যে ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’ এবং ‘ছুটির দিন দুপুরে’ অন্যতম।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দেশের বহু মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হন। এর মধ্যে রয়েছে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬১), একুশে পদক (১৯৭৮) এবং মরণোত্তর দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ (১৯৮৮)।
পারিবারিক জীবনেও তিনি একটি সফল সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন। তাঁর পুত্র মঈনুল আহসান সাবের দেশের একজন অত্যন্ত বিশিষ্ট ও জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক এবং প্রকাশক। অন্যদিকে তাঁর কন্যা কেয়া চৌধুরীও একজন সুপরিচিত অভিনেত্রী ও উপস্থাপিকা হিসেবে সংস্কৃতি অঙ্গনে কাজ করছেন।
১৯৮৫ সালের ১০ জুলাই ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাংলা সাহিত্যের এই নিভৃতচারী ও সাধক কবি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। তিনি শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর জীবনমুখী কবিতা, মেদহীন ভাষা এবং গভীর মানবিক বোধ আজও বাংলা সাহিত্যপ্রেমীদের হৃদয়ে অবিরাম বয়ে চলেছে।
মন্তব্য