খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ই জুলাই ২০২৬, ১২:২২ এএম

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) এক নবীন শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাস থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে বহিরাগতদের সহায়তায় মারধর ও মানসিক নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের এক শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর দাবি, নির্জন ইটভাটায় নিয়ে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে বলা হয়, ‘এখানে পুঁতে ফেললেও কেউ জানবে না’। এই ঘটনায় জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও প্রক্টর বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুরের দিকে চবি ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী ব্রিকফিল্ড (ইটভাটা) এলাকায় এই নজিরবিহীন হেনস্তার ঘটনা ঘটে।
নির্যাতনের শিকার মো. রায়হান বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের প্রথম বর্ষের একজন শিক্ষার্থী। অন্যদিকে অভিযুক্ত আল মামুন চবি শাখা ছাত্রদলের ক্রীড়া সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন।
Table of Contents
লিখিত অভিযোগ এবং ভুক্তভোগী রায়হানের বিবরণ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে বসে ছিলেন। এ সময় ছাত্রদল নেতা আল মামুন তাঁর ৫ থেকে ৬ জন সহযোগীসহ সেখানে আসেন এবং রায়হানের পরিচয় জানতে চান। একপর্যায়ে কথা বলার নাম করে তাকে জোরপূর্বক মাঠ থেকে তুলে ক্যাম্পাসের বাইরে নির্জন স্লুইজ গেট ও ব্রিকফিল্ড (ইটভাটা) এলাকার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
ভুক্তভোগীর জবানবন্দি: “তারা আমাকে আটকে রেখে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি নেওয়ার চেষ্টা করছিল এবং সেই দৃশ্য মোবাইলে ভিডিও করছিল। প্রচণ্ড ভয়ের মধ্যে তারা আমাকে হুমকি দিয়ে বলে, ‘এখানে যদি তোকে পুঁতে ফেলি, কেউ জানতেও পারবে না। তোর ছাত্রত্ব বাতিল করে দেব।’ চরম আতঙ্কের মুখে আমি আত্মরক্ষার্থে ফাহিম নামে একজনের নাম বলতে বাধ্য হই।”
রায়হান জানান, ইটভাটায় নিয়ে যাওয়ার আগে স্লুইজ গেটের পাশে মামুন এক প্রভাবশালী বড় ভাইকে ফোন দেন এবং রায়হানকে ভয় দেখানোর জন্য বলেন, “জানিস কারে ফোন দিলাম? হাবিব ভাইকে ফোন দিয়েছিলাম।” এরপর ইটভাটার নির্জন স্থানে নিয়ে রায়হানের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং জোরপূর্বক তল্লাশি চালানো হয়। সেখানে তাকে নানাভাবে জেরা করা শুরু হয়। একপর্যায়ে রায়হানকে শারীরিকভাবে চরম হেনস্তা করা হয় এবং চড়-থাপ্পড় মারা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এই ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল গত ২৯ জুন। সেদিন টেলিভিশনে ব্রাজিল বনাম জাপানের ফুটবল ম্যাচ দেখাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন’ এবং ছাত্রদল নেতা মামুনের অনুসারীদের মধ্যে প্রথমে কথা কাটাকাটি ও পরে হাতাহাতি হয়। এই ঘটনাটি পরবর্তীতে বড় আকার ধারণ করে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে রূপ নেয়।
অভিযুক্ত আল মামুনের সন্দেহ ছিল, প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী রায়হান ওই দিনের মারামারির ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন এবং প্রতিপক্ষকে ইন্ধন জুগিয়েছেন। সেই পুরোনো ক্ষোভ ও সন্দেহের জের ধরেই বৃহস্পতিবার রায়হানকে একা পেয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে তল্লাশি ও নির্যাতন চালানো হয়।
| বিবরণের ক্ষেত্র | সংশ্লিষ্ট তথ্য |
| ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী | মো. রায়হান (ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সেশন: ২০২৩-২৪) |
| প্রধান অভিযুক্ত | আল মামুন (ক্রীড়া সম্পাদক, চবি শাখা ছাত্রদল) |
| ঘটনার তারিখ ও সময় | ৯ জুলাই, ২০২৬ (বৃহস্পতিবার); দুপুর ১২:৩০ টা |
| ঘটনাস্থল | চবি কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ এবং সংলগ্ন ব্রিকফিল্ড (ইটভাটা) এলাকা |
| অভিযোগের ধরন | জোরপূর্বক অপহরণ, শারীরিক মারধর, মুঠোফোন তল্লাশি ও প্রাণনাশের হুমকি |
| উৎস বিরোধ | ২৯ জুনের ব্রাজিল-জাপান ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে মারামারি |
| তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ | প্রক্টোরিয়াল বডি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় |
মারধর ও হুমকির অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা আল মামুন। তাঁর দাবি, “গত ৩০ জুন স্টেশনে কিছু ছেলে মিলে আমার ওপর হামলা করেছিল। সেই হামলাকারীদের দলে এই রায়হানও উপস্থিত ছিল। বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে তাকে দেখতে পেয়ে আমি কেবল সেদিনের ঘটনার বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম। তাকে কোনো ধরনের মারধর বা হুমকি দেওয়া হয়নি। জোরপূর্বক ভিডিও ধারণের যে দাবি সে করেছে, সেটিও সম্পূর্ণ banoat ও মিথ্যা। জিজ্ঞাসা শেষে আমি নিজেই তাকে চলে যেতে বলেছি।”
এই বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী সংবাদমাধ্যমকে জানান, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মোবাইল ফোনে বিষয়টি জানানোর পর কার্যালয়ে এসে একটি লিখিত অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন। প্রক্টর বলেন, “অভিযোগটি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে নিয়মানুযায়ী প্রয়োজনীয় ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তদন্তের স্বার্থে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে রাতে প্রক্টর অফিসে এসে দেখা করার জন্য বলা হয়েছে।” এই ঘটনার পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিরাপত্তার অভাব বোধ তৈরি হয়েছে।
মন্তব্য