গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র নদে দিনদুপুরে এক দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। অস্ত্রের মুখে একটি খেয়া নৌকার যাত্রীদের জিম্মি করে নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও মুঠোফোন লুট করেছে মুখোশধারী ডাকাত দল। এই সময় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ব্র্যাক’-এর দুই কর্মকর্তার কাছ থেকে ঋণের কিস্তি আদায়ের প্রায় ৭ লাখ frugality ৭৯ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুরে উপজেলার উড়িয়া ইউনিয়নের কাঁটাতারা এলাকা থেকে ফজলুপুর ইউনিয়নের কাবিলপুর ঘাটের মধ্যবর্তী নদীপথে এই ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যায় পুলিশ, ভুক্তভোগী যাত্রী এবং সংশ্লিষ্ট এনজিও কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ডাকাতির এই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ডাকাতির শিকার ব্র্যাকের ওই দুই কর্মকর্তা হলেন— সহকারী শাখা ব্যবস্থাপক নিরঞ্জন চন্দ্র রায় এবং কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অফিসার (সিডিও) রাকিব হাসান। ঘটনার সময় ওই খেয়া নৌকায় তাঁদের পাশাপাশি আরও অন্তত ১০-১২ জন সাধারণ যাত্রী ছিলেন।
Table of Contents
যেভাবে ঘটল সেই ভয়ংকর ডাকাতি
স্থানীয় ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার ফজলুপুর ইউনিয়নে ব্র্যাকের ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের মাসিক কিস্তি আদায়ের দিন ছিল। সংস্থার সেলাই ও ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের ছয়জন কর্মী সকাল থেকে বিভিন্ন চরে ঘুরে ঋণের টাকা সংগ্রহ করেন। সংগৃহীত টাকার একটি বড় অংশ ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্য দুপুরে রওনা হন নিরঞ্জন চন্দ্র ও রাকিব হাসান। দুপুর আনুমানিক ৩টার দিকে কাবিলপুর চরের খেয়াঘাট থেকে সাইদুর রহমান নামের এক মাঝির নৌকায় তাঁরা চড়েন। নৌকাটি ছাড়ার আধঘণ্টা পর নদীপথের উড়িয়া ইউনিয়ন এলাকায় পৌঁছালে পেছন থেকে ৬-৭ জনের একটি ছোট নৌকা এসে খেয়া নৌকাটির গতি রোধ করে।
খেয়া নৌকার চালক সাইদুর রহমান জানান, ডাকাত দলের সবার মুখ ঢাকা ছিল এবং মাথায় লম্বা ক্যাপ পরা ছিল। তাদের মধ্যে ২-৩ জন রামদা হাতে খেয়া নৌকায় চড়ে বসে। এসেই তারা নৌকার তেলের লাইন কেটে দেয় এবং নৌকার হ্যান্ডেলটি নদীতে ফেলে দেয় যাতে কেউ পালিয়ে যেতে না পারে। বাকি ডাকাতরা নিজেদের নৌকা থেকে যাত্রীদের দিকে পিস্তল তাক করে রেখেছিল।
মাঝি সাইদুর রহমানের বিবরণ: “ডাকাতরা রামদা উঁচিয়ে আমাদের কোণঠাসা করে ফেলে। মুহূর্তের মধ্যে তেলের পাইপ কেটে নৌকার হ্যান্ডেল নদীতে ফেলে দেয়। নড়াচড়া করার কোনো সুযোগই ছিল না।”
রামদা ও পিস্তলের মুখে পুরো নৌকার যাত্রীরা স্তব্ধ হয়ে যান। ডাকাতরা ব্র্যাক কর্মকর্তাদের কাছে থাকা ব্যাগ ও কিস্তির ৭ লাখ ৭৯ হাজার ৮০ টাকা ছিনিয়ে নেয়। এছাড়া নৌকায় থাকা তিন নারী যাত্রীর ভ্যানিটি ব্যাগ, দুটি দামি স্মার্টফোন, এক নারীর হাত থেকে নগদ ১০ হাজার টাকা এবং নৌকাচালকের কাছে থাকা ভাড়ার ৩০০-৪০০ টাকাও লুটে নেয় তারা। নারীদের একজনের ব্যাগে স্বর্ণের কানের দুল ছিল বলে জানা গেছে।
পরীক্ষার্থীর প্রবেশপত্রও নিয়ে গেছে ডাকাতরা
নৌকার যাত্রী ও কাবিলপুর বাজারের কীটনাশক ব্যবসায়ী আইয়ুব আলী তাঁর জীবনের প্রথম এমন ভয়ংকর Experiences বা অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, “তিনজন ডাকাতের হাতে পিস্তল ছিল। পিস্তল দেখে আমরা সবাই ভয়ে কাঁপছিলাম।” তিনি আরও জানান, তাঁর মামাতো বোন জান্নাতির আজ শুক্রবার থেকে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা।
পরীক্ষার কেন্দ্রে সময়মতো পৌঁছানোর জন্য সে আগের দিনই চরের বাড়ি থেকে এপারে আসছিল। কিন্তু ডাকাতরা জান্নাতির ব্যাগটিও কেড়ে নিয়েছে, যেটির ভেতরে তার এইচএসসি পরীক্ষার মূল প্রবেশপত্র (অ্যাডমিট কার্ড) ছিল। প্রবেশপত্রটি হারিয়ে যাওয়ায় পরীক্ষার্থী জান্নাতি ও তার পরিবার চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছে।
ঘটনার মূল বিবরণ ও ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান
| বিবরণ ও সূচক | সংশ্লিষ্ট তথ্য |
| প্রধান ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠান | বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ব্র্যাক’ |
| ক্ষতিগ্রস্ত কর্মকর্তা | নিরঞ্জন চন্দ্র রায় (সহকারী শাখা ব্যবস্থাপক) ও রাকিব হাসান (সিডিও) |
| লুট হওয়া এনজিওর ফান্ড | ৭,৭৯,০৮০ টাকা (সাত লাখ ঊনআশি হাজার আশি টাকা) |
| সাধারণ যাত্রীদের ক্ষয়ক্ষতি | ৩টি ভ্যানিটি ব্যাগ, ২টি স্মার্টফোন, নগদ ১০,০০০ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার |
| পরীক্ষার্থীর বড় ক্ষতি | এইচএসসি পরীক্ষার্থী জান্নাতির মূল প্রবেশপত্র (অ্যাডমিট কার্ড) লুট |
| নৌকার চালক/মাঝি | সাইদুর রহমান (নৌকার তেলের লাইন ও হ্যান্ডেল ক্ষতিগ্রস্ত) |
| ঘটনাস্থল ও থানা | ব্রহ্মপুত্র নদ (উড়িয়া ইউনিয়ন এলাকা), ফুলছড়ি থানা, গাইবান্ধা |
| ডাকাত দলের বিবরণ | ৬-৭ জন (মুখোশ ও ক্যাপ পরিহিত, অস্ত্র: পিস্তল ও রামদা) |
আইনগত ব্যবস্থা ও পুলিশের তৎপরতা
ব্র্যাকের ডিস্ট্রিক্ট কো-অর্ডিনেটর (ক্ষুদ্র ঋণ) মোশাররফ হোসেন জানান, তাঁদের কর্মীরা সকালের কালেকশনের মোট ৭ লাখ ৭৯ হাজার ৮০ টাকা নিয়ে ব্যাংকে জমা দিতে যাচ্ছিলেন। বাকি চারজন কর্মী অন্য চরে কাজ শেষে পরে আসার কথা ছিল। নদীপথে ডাকাতরা তাঁদের জিম্মি করে সব টাকা নিয়ে গেছে। এই ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে এবং ব্র্যাকের কর্মকর্তারা ফুলছড়ি থানায় অবস্থান করছেন।
ফুলছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দুরুল হুদা জানান, নদীপথে ডাকাতির শিকার ভুক্তভোগীরা থানায় এসেছেন। প্রাথমিকভাবে বড় অঙ্কের টাকা ও মালামাল লুটের সত্যতা পাওয়া গেছে। পুলিশ তাঁদের সাথে কথা বলে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছে।
এদিকে গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ… উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সহকারী পুলিশ সুপার (বি-সার্কেল) শেখ মুত্তাজুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, “আমরা পুরো ঘটনাটি গভীরভাবে খতিয়ে দেখছি। নদীপথে নিরাপত্তা জোরদার করাসহ এই চক্রটিকে চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে পুলিশের একাধিক টিম কাজ শুরু করেছে।”









