খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ই জুলাই ২০২৬, ৩:৪৬ পিএম

নতুন অর্থবছর শুরু হলেও সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রত্যাশিত নবম পে স্কেলের গেজেট এখনো প্রকাশ হয়নি। বিষয়টি নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আগ্রহ ও অপেক্ষা বাড়লেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিদ্ধান্তহীনতার কারণে এ প্রক্রিয়া আটকে নেই। বরং নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের আগে আর্থিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ধাপ সম্পন্ন করার কাজ চলছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ সরকারি কর্মীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এর সঙ্গে দেশের সামগ্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আয়, মূল্যস্ফীতি, সরকারি ঋণের চাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ের বিষয় জড়িত।
আগের প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী যে পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন হতে পারে, তা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি বেতন কাঠামো তৈরি করা, যাতে সরকারি কর্মীরা আর্থিকভাবে উপকৃত হন, আবার একই সঙ্গে রাষ্ট্রের ব্যয় ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের চাপ তৈরি না হয়।
নতুন পে স্কেলে মূল বেতন ছাড়াও বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত সুবিধা, উৎসব ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধার পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু বেতন বাড়ালেই হবে না; পুরো কাঠামোকে আধুনিক ও বাস্তবসম্মত করার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
সরকারের নীতিগত পরিকল্পনা অনুযায়ী, নবম পে স্কেল কার্যকরের সম্ভাব্য তারিখ চলতি বছরের ১ জুলাই ধরা হচ্ছে। অর্থাৎ চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ হলে ওই তারিখ থেকে নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন-ভাতা সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে তার আগে সচিব কমিটির সুপারিশ, মন্ত্রিসভার অনুমোদন, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং আইনগত যাচাই সম্পন্ন করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, একবারে পুরো পে স্কেল কার্যকর করার পরিবর্তে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রাথমিক আলোচনায় দুই অর্থবছরে সর্বোচ্চ তিন ধাপে বাস্তবায়নের একটি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর আওতায় প্রথম ধাপে মূল বেতন কার্যকর করা, পরবর্তী সময়ে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামোতে বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে ভারসাম্য আনার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা চলছে। বিশেষ করে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের আর্থিক সুবিধা তুলনামূলকভাবে বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে ১ থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত রাখার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
আগের সুপারিশে সর্বোচ্চ ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন ও ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব ছিল। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ওই হারে সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। সরকারের ব্যয় সক্ষমতা বিবেচনায় রেখে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আর্থিক বিষয় ছাড়াও রয়েছে বড় ধরনের প্রশাসনিক প্রস্তুতি। নতুন কাঠামো চালু হলে সরকারি হিসাব ব্যবস্থার সফটওয়্যার পরিবর্তন, নতুন বেতন নির্ধারণ, পেনশন পুনর্গণনা এবং বিভিন্ন দপ্তরের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সমন্বয় করতে হবে। এসব প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করতেও সময় প্রয়োজন হচ্ছে।
গত সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে পুনর্গঠিত সচিব কমিটির পঞ্চম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে পে স্কেল বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, এটি একটি বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত হওয়ায় তাড়াহুড়ো না করে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া একজন কর্মকর্তা জানান, নতুন পে স্কেল কেবল সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয় নয়, এর প্রভাব দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতেও পড়বে। তাই ব্যয়ের পরিমাণ, বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক চাপ বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি প্রস্তাব যাচাই করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, চলতি জুলাই মাসের শেষ নাগাদ সচিব কমিটি তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিতে পারে। এর আগে আরও কয়েক দফা আলোচনায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মতামত, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে পর্যালোচনা করা হবে।
সচিব কমিটির সুপারিশ পাওয়ার পর বিষয়টি মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এরপর প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়া শেষ হলে সরকারি গেজেট প্রকাশের পথ খুলবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন পে স্কেল নিয়ে প্রত্যাশা দীর্ঘদিনের। অনেকেই মনে করছেন, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বাস্তবতায় নতুন বেতন কাঠামো প্রয়োজন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এমন একটি কাঠামো তৈরির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যা কর্মীদের আর্থিক স্বস্তি দেওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্যও বজায় রাখবে। ফলে গেজেট প্রকাশে কিছুটা সময় লাগলেও এর মাধ্যমে একটি টেকসই ও বাস্তবসম্মত পে স্কেল প্রণয়নের চেষ্টা চলছে।
মন্তব্য