খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই জুলাই ২০২৬, ১১:২৯ পিএম

বর্তমান যুগে এশিয়ার বীমা শিল্প গ্রাহকদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে তাদের ব্যবসায়িক মডেলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। বয়োবৃদ্ধ জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সুরক্ষার ঘাটতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) দ্রুত প্রসার বীমা কোম্পানিগুলোকে প্রথাগত পলিসি বিক্রির গণ্ডি থেকে বের হয়ে আসতে বাধ্য করছে। কোম্পানিগুলো এখন কেবল নির্দিষ্ট মেয়াদের পলিসি বিক্রি না করে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত আর্থিক নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার সুনির্দিষ্ট সমাধান দিতে মনোযোগী হচ্ছে। সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত এশিয়ান ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স এবং ইন্স্যুরেন্স এশিয়া সামিটে উঠে এসেছে এ খাতের নানা চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার কথা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে দীর্ঘায়ু হওয়া বা বেশি দিন বেঁচে থাকা মানুষের অন্যতম প্রধান ভাবনার বিষয়। এআইএ গ্রুপের ইউনিট-লিঙ্কড অ্যান্ড পেনশন বিজনেসের সিইও শ্রীকান্ত ভাট বলেন, গ্রাহকেরা এখন কেবল পলিসি কিনতে চান না, বরং দীর্ঘায়ু জীবনের আর্থিক ও স্বাস্থ্যগত সুবিধাগুলো নিশ্চিত করতে চান। অবসরের পর ভালো জীবনযাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সম্পদ এবং সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্য পরিকল্পনাই এখন গ্রাহকের কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সম্মেলনে সিঙ্গাপুর, জাপান ও হংকংয়ের মতো উন্নত অঞ্চলের জনসংখ্যাগত সংকটের চিত্র তুলে ধরা হয়। আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রোল্যান্ড বার্জারের পার্টনার লরেন্ট ডুসেট জানান, ২০৫০ সালের মধ্যে সিঙ্গাপুরের ওল্ড-এজ ডিপেন্ডেন্সি রেশিও বা বয়োবৃদ্ধ মানুষের ওপর নির্ভরশীলতার অনুপাত বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছাবে। একই সময়ে জাপানে এই অনুপাত ৭৫ শতাংশ এবং হংকংয়ে প্রায় ১০০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট সংকেত দেয় যে, বীমা কোম্পানিগুলোকে এখন থেকেই অবসরকালীন নিরাপত্তা, ক্রমবর্ধমান চিকিৎসা ব্যয় এবং সম্পদ সংরক্ষণের মতো বিষয়গুলোর ওপর জোর দিতে হবে।
উচ্চ মাথাপিছু আয় থাকা সত্ত্বেও সিঙ্গাপুরের মতো ধনী দেশে সুরক্ষার এক বিশাল ঘাটতি রয়ে গেছে। সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৬৫,৫৫৫ ডলার এবং এখানকার মানুষ আয়ের প্রায় ৩৬ শতাংশ সঞ্চয় করে। সিংলাইফের ডিস্ট্রিবিউশন প্রধান অখিল দুয়েগার বলেন, এত ধনী দেশ হওয়া সত্ত্বেও মানুষ এখনো উপযুক্ত স্বাস্থ্য ও জীবন সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছে। এর মূল কারণ বীমা কোম্পানিগুলো এতদিন গ্রাহকের প্রকৃত চাহিদার চেয়ে নিজেদের প্রোডাক্ট বিক্রির দিকে বেশি মনোযোগী ছিল। গ্রাহকের আসল প্রয়োজন হলো জীবনের যেকোনো পর্যায়ে তাদের নগদ অর্থের প্রবাহ (Cash flow) সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার সুবিধা পাওয়া।
লাইফ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন, সিঙ্গাপুরের (LIA Singapore) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই খাতের সার্বিক প্রবৃদ্ধি বেশ ইতিবাচক। ২০২৫ সালের সামগ্রিক পরিসংখ্যান এবং নতুন ব্যবসার প্রিমিয়াম আয়ের চিত্র নিচে একটি তালিকায় দেওয়া হলো:
| ক্রমিক | বিবরণ / সূচক (২০২৫ সালের তথ্য) | পরিসংখ্যান ও অনুপাত |
| ১ | মোট ওয়েটেড নিউ বিজনেস প্রিমিয়াম | ৫.২ বিলিয়ন ডলার (S$৬.৫৩ বিলিয়ন) |
| ২ | ২০২৪ সালের তুলনায় মোট প্রিমিয়াম প্রবৃদ্ধি | ১১.৩% বৃদ্ধি |
| ৩ | চতুর্থ প্রান্তিকে (Q4) নতুন বিজনেস প্রিমিয়াম বৃদ্ধি | ১৩.০% বৃদ্ধি |
| ৪ | নতুন ব্যবসায় ইনভেস্টমেন্ট-লিঙ্কড প্রোডাক্টের (ILP) অংশ | ৪৪% (সর্বোচ্চ অংশীদারিত্ব) |
| ৫ | সিঙ্গাপুরের বর্তমান জাতীয় সঞ্চয়ের হার | আয়ের ৩৬% |
| ৬ | সিঙ্গাপুরের বর্তমান মাথাপিছু জিডিপি | $৬৫,৫৫৫.০৬ |
| ৭ | সিঙ্গাপুরের বর্তমান ওল্ড-এজ ডিপেন্ডেন্সি রেশিও | প্রায় ২০% |
| ৮ | ২০৫০ সালে সিঙ্গাপুরের সম্ভাব্য ওল্ড-এজ ডিপেন্ডেন্সি রেশিও | প্রায় ৪০% |
| ৯ | ২০৫০ সালে জাপানের সম্ভাব্য ওল্ড-এজ ডিপেন্ডেন্সি রেশিও | প্রায় ৭৫% |
| ১০ | ২০৫০ সালে হংকংয়ের সম্ভাব্য ওল্ড-এজ ডিপেন্ডেন্সি রেশিও | প্রায় ১০০% |
সম্মেলনে অংশ নেওয়া প্রযুক্তি ও বীমা বিশেষজ্ঞরা একমত হয়েছেন যে, বীমা খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ভূমিকা দিন দিন বাড়বে, তবে এটি কখনোই মানুষের বিকল্প হবে না। সুইস লাইফ সিঙ্গাপুরের সিইও হাভিয়ের লাস্ত্রা মনে করেন, এই শিল্পের আসল শক্তি হলো ব্যক্তিগত এবং বিশ্বস্ত পরামর্শ। মানুষ যখন বীমা করে, তখন সে তার অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করে, যার ভিত্তি হলো পারস্পরিক বিশ্বাস। এআই মূলত মানুষের সেই সেবাকে আরও সমৃদ্ধ ও নির্ভুল করতে সাহায্য করবে।
ইউনাইটেড ওভারসিজ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের স্ট্র্যাটেজি প্রধান পলিন সিম গ্রাহক-কেন্দ্রিক সেবা ও তথ্যের নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর জোর দেন। অন্যদিকে ইতিকা ইন্স্যুরেন্সের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ডেনিস লিউ জানান, তথ্যের সঠিক ব্যবহার না হওয়া এই খাতের বড় বাধা। তারা ইতিমধ্যে এআই ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয় ট্রাভেল ডিলে ক্লেইম, অগ্নিকাণ্ডের পর স্বয়ংক্রিয় যোগাযোগ এবং দুর্ঘটনা শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু করেছেন, যা গ্রাহকের আবেদনের আগেই ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়া শুরু করে। ভবিষ্যতে যারা স্বল্পমেয়াদী বিক্রির লক্ষ্য বাদ দিয়ে গ্রাহকের দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণে কাজ করবে, তারাই এই বাজারে টিকে থাকবে।
মন্তব্য