খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই জুলাই ২০২৬, ৬:৮ পিএম

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজ শাহীন খসরুর পথ রোধ করে ‘ঘুষের টাকা’ ফেরত চাওয়ার একটি ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। গত সোমবার দুপুরের পর তেঁতুলিয়া উপজেলা পরিষদ চত্বরে রেহেনা বেগম (ঊর্মি) নামের এক নারী নিজের ফেসবুক আইডি থেকে এই ঘটনার একটি লাইভ ভিডিও সম্প্রচার করেন।
৯ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডের ওই ফেসবুক লাইভে দেখা যায়, কার্যালয় থেকে বের হয়ে নিজের গাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন ইউএনও আফরোজ শাহীন খসরু। ঠিক তখনই কান্নাজড়িত কণ্ঠে লাইভ করতে করতে ওই নারী ইউএনওর সামনে গিয়ে বলেন, ‘আপনি চাকরি দিতে চাইছেন, এখন মিথ্যা কথা বলিয়েন না।’ এ সময় ইউএনওর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একজন আনসার সদস্য বাধা দিতে এলে ওই নারী উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘আপনি ফোন নিচ্ছেন কেন? ফোন নিবেন না। নাইলে কিন্তু সমস্যা হবে, আমি গরিব লোক।’ একপর্যায়ে ইউএনও নারীটিকে প্রশ্ন করেন, ‘কত টাকা দিছেন?’ জবাবে রেহেনা বেগম বলেন, ‘১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিছি আপনাকে।’
ভিডিওতে ইউএনওকে আবারও জিজ্ঞেস করতে শোনা যায়, ‘কোন জায়গায় দিছেন?’ তখন ওই নারী বলেন, ‘আপনার অফিসে দিছি ছয় মাস আগে। তখন ডিসেম্বর মাস। তিন মাস আগেও তো আমি আপনার অফিসে আসছি স্যার, আপনি এ রকম কেন শুরু করছেন?’ তবে ইউএনও আফরোজ শাহীন খসরু সম্পূর্ণ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আপনাকে তো আমি চিনি না। আপনার ছেলে কে? তাই তো চিনি না। আপনাকে সিনক্রিয়েট করতে পাঠায় দিল আর আপনি এসে নকশা করতেছেন এই জায়গায় এসে?’
এরপর ওই নারী বলেন, ‘আমি আপনার সাথে নকশা করব কেন, বলেন। আপনি আমার টাকাটা দিয়ে দেন স্যার, আপনি আমাকে জেলে দেন, ফাঁসি দেন, যা-ই দেন, আমার টাকাটা লাগবে। আজকে আমি তিন দিন ধরে ঘুমাতে পারি না, আপনি টেনেসফার (বদলি) হবেন।’ লাইভের শেষের দিকে ওই নারী পাশের একজনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘দেখত ভাইয়া লাইভটা হইছে না? এখন কাটব কেমনে বলেন? আমি এখন ডিসির কাছে যাব।’
ঘটনার পর সোমবার সন্ধ্যায় পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক শুকরিয়া পারভীনের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন তেঁতুলিয়া উপজেলা সদর ইউনিয়নের মাগুরা এলাকার বাসিন্দা রেহেনা বেগম। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, তাঁর ছেলেকে গ্রাম পুলিশের (চৌকিদার) চাকরি দেওয়ার কথা বলে ইউএনও ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন। এখন টাকা ফেরত চাওয়ায় তাঁকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
মুঠোফোনে আমাদের প্রতিনিধি সঙ্গে আলাপকালে রেহেনা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে লেখাপড়া তেমন একটা করে নাই। আমি ছয় মাস আগে ইউএনও স্যারকে গিয়ে বলছি যে স্যার আমরা গরিব মানুষ, একটা কাজের ব্যবস্থা করে দেন। তখন উনি চৌকিদারের চাকরি দেওয়ার কথা বলেন। এ জন্য প্রথমে ৫ লাখ চাইলেও পরে ৩ লাখের কথা বলেন। পরে আমি আমার মায়ের জমি বেইচা ১ লাখ আর আমরা কিছু দিয়ে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিয়েছি। উনি ট্রান্সফার হবেন শুনে আমি ওখানে গেছি।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘মঙ্গলবার আমাকে ডিসি অফিসে ডেকে প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা তদন্তের জন্য জেরা করেছে। আমি ওই দিন থেকে ভয়ে বাড়িতে যেতে পারছি না। সোমবার আমার ছোট ছেলেকে এবং আমি যার সাথে পেজের জন্য ড্যান্স করি, ওই ছেলেকে তুলে নিয়ে গিয়ে পরে ছেড়ে দিছে।’
এদিকে, ঘটনাটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর তেঁতুলিয়াসহ জেলাজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ইউএনওর পক্ষে মঙ্গলবার তেঁতুলিয়ায় দুই দফা মানববন্ধন করা হয়েছে। বেলা ১১টার দিকে উপজেলা পরিষদ চত্বরে ‘বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের’ ব্যানারে এবং সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে উপজেলা শহরের তেঁতুলতলায় ‘উপজেলার সর্বস্তরের জনসাধারণ’ ব্যানারে এই কর্মসূচি পালন করা হয়। মানববন্ধনে বক্তারা এটিকে ইউএনওর বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র আখ্যা দিয়ে ওই নারী ও তাঁর ইন্ধনদাতাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
তদন্তে নেমে ওই নারীর প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রেহেনা বেগম যে জমিতে বাড়ি করে আছেন, সেটি জেলা পরিষদের জায়গা। প্রায় ১০ বছর আগে তিনি সেখানে এসে টিনের বেড়া দেওয়া ঘর তুলে দুই ছেলেকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন প্রতিবেশী বলেন, ‘ওনার ছেলে তো পড়াশোনা জানে না। গ্রাম পুলিশের চাকরি করতে গেলে তো অন্তত অষ্টম শ্রেণি পাস করতে হবে। তা ছাড়া গ্রাম পুলিশের চাকরির জন্য একসঙ্গে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ওনারা কোথা থেকে পেলেন? আমাদের মনে হচ্ছে, এটা কোনো ষড়যন্ত্র হতে পারে।’
অভিযোগের বিষয়ে ইউএনও আফরোজ শাহীন খসরু আমাদের প্রতিনিধি কে বলেন, ‘যে নারী কথা বলার আগে ফেসবুক লাইভ করতে পারে, সে কি কোনো প্রমাণ না রেখেই আমাকে টাকা দিয়ে চলে গেল? তিনি একজন টিকটকার। তাঁকে দিয়ে এর আগেও নাকি অনেককে ব্ল্যাকমেল করা হয়েছিল। কোনো ষড়যন্ত্রকারী হয়তো তাঁকে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের একেবারে নিম্ন পন্থাটা অবলম্বন করেছে।’
যোগাযোগ করা হলে পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক শুকরিয়া পারভীন আমাদের প্রতিনিধি কে নিশ্চিত করে জানান, ওই নারীর দেওয়া অভিযোগের বিষয়ে ইতোমধ্যে নিবিড় তদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে এবং তদন্তে অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য