শতবর্ষ পেরিয়েও সমকালীন: সুরের বরপুত্র হেমন্ত মুখোপাধ্যায়

‘তুমি এলে, অনেক দিনের পরে যেন বৃষ্টি এল’, ‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়’, ‘এই রাত তোমার আমার’, কিংবা ‘মুছে যাওয়া দিনগুলি আমায় যে পিছু ডাকে’—বাঙালির সংজ্ঞায় এই গানগুলো শুধু সুরের মূর্ছনা নয়, বরং এক একটি আবেগের দলিল। যুগের পর যুগ পেরিয়ে গেলেও বাংলা গানের এই অমূল্য সৃষ্টিগুলো হারিয়ে যায়নি; বরং রেডিও, গ্রামোফোন, ক্যাসেট, সিডি পেরিয়ে বর্তমানের ডিজিটাল ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মেও সমানভাবে আধিপত্য বিস্তার করে আছে। আর এই দীর্ঘ সুরযাত্রার মূল সারথি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগীতশিল্পী ও সুরকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। বাঙালি সংস্কৃতির অলিগলি থেকে শুরু করে ক্যানটিন, আড্ডা, কিংবা বর্ষার বিকেলে জানালার পাশে একা বসে থাকা মানুষের একাকীত্ব—সবখানেই তাঁর কণ্ঠের উপস্থিতি সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়েও, তথা তাঁর জন্মের এক শতাব্দীরও বেশি সময় পার হওয়ার পরেও, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানের আবেদন বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি। প্রতি বছর ১৬ জুন তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সংগীতপ্রেমী মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব ও বিভিন্ন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে তাঁর গান ও স্মৃতিচারণার মাধ্যমে এই মহান শিল্পীকে স্মরণ করেন।

বেনারসের শৈশব ও গল্পলেখক হওয়ার স্বপ্ন

১৯২০ সালের ১৬ জুন ব্রিটিশ ভারতের বেনারসে (বর্তমান উত্তরপ্রদেশ, ভারত) জন্মগ্রহণ করেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল পশ্চিমবঙ্গের জয়নগরে। পরবর্তীতে তাঁর পরিবার কলকাতায় চলে আসে। কলকাতার ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে পড়াশোনার সময় তাঁর সখ্যতা গড়ে ওঠে বাংলা সাহিত্যের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র—কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় এবং সাহিত্যিক সন্তোষকুমার ঘোষের সঙ্গে। ছাত্রজীবনে হেমন্তের মূল ঝোঁক ছিল সাহিত্যচর্চায়। তিনি ছোটগল্প লিখতেন এবং তৎকালীন বিখ্যাত ও প্রভাবশালী সাহিত্য পত্রিকা দেশ-এ তাঁর গল্প প্রকাশিত হয়েছিল।

শৈশবে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সংগীত শিক্ষা না থাকলেও গ্রামোফোনে গান শুনে শুনে তিনি সুর আত্মস্থ করতেন। বন্ধু শ্যামসুন্দরের বাড়ির হারমোনিয়াম ও গ্রামোফোন রেকর্ডই ছিল তাঁর প্রাথমিক সংগীত শিক্ষার ক্ষেত্র। স্কুলজীবনে বন্ধুদের সাথে গান গাওয়ার অপরাধে একবার তাঁকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তবে সহপাঠীদের প্রতিবাদ এবং তাঁর বাবার বিনয়ী ও ধৈর্যশীল ভূমিকার কারণে সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। বাবার এই শান্ত ও সহনশীল মনোভাব হেমন্তের চরিত্র গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যা তাঁর পরবর্তী পেশাদার জীবনেও প্রতিফলিত হয়।

রেডিওতে অভিষেক ও প্রথম রেকর্ড

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সংগীতজীবনে আসার পেছনে তাঁর স্কুলজীবনের বন্ধু কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। ১৯৩৫ সালে সুভাষের জোরাজুরিতেই তিনি তৎকালীন ‘ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন’ (যা পরবর্তীতে অল ইন্ডিয়া রেডিও নামে পরিচিত হয়)-এ অডিশন দেন। অডিশনে সন্তোষ সেনগুপ্তের ‘আজও পড়ে গো মনে’ গানটি গেয়ে তিনি নির্বাচিত হন। প্রথমদিকে তাঁর বাবার গান গাওয়ার প্রতি আপত্তি থাকলেও পরবর্তীতে পরিবারের সম্মতিতে তিনি নিয়মিত গান গাওয়া শুরু করেন। রেডিওর জন্য প্রথম গান ‘আমার গানেতে এলে নবরূপে চিরন্তনী’ লিখেছিলেন বন্ধু সুভাষ মুখোপাধ্যায়।

রেডিওতে পরিচিতি পেলেও প্রথমদিকে কোনো নামী রেকর্ড কোম্পানি (যেমন: এইচএমভি, মেগাফোন বা সেনোলা) তাঁকে সুযোগ দিতে চায়নি। পরবর্তীতে বাবার বন্ধু শান্তি বসুর সহায়তায় বিখ্যাত সুরকার শৈলেশ দত্তগুপ্তের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। ১৯৩৭ সালে শৈলেশ দত্তগুপ্তের সুরে এবং নরেশ্বর ভট্টাচার্যের কথায় হেমন্তের প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড প্রকাশিত হয়, যার গান দুটি ছিল—‘জানিতে যদি গো তুমি’ এবং ‘বলো গো বলো মোরে’।

সলিল চৌধুরী ও গণসংগীতের নতুন অধ্যায়

সংগীতজীবনের শুরুর দিকে হেমন্তের গায়কিতে বিখ্যাত শিল্পী পঙ্কজ মল্লিকের স্পষ্ট প্রভাব থাকায় শ্রোতারা তাঁকে ‘ছোট পঙ্কজ’ বলে ডাকতেন। তবে ১৯৪৪ সালে নিজের সুরে ‘কথা কয়ো নাকো, শুধু শোনো’ গানটি রেকর্ড করার পর তিনি নিজের একটি স্বতন্ত্র গায়কি ও ধারা তৈরি করেন।

চল্লিশের দশকের শেষভাগে ‘ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন’ (আইপিটিএ) বা ভারতীয় গণনাট্য সংঘের মাধ্যমে সুরকার ও গীতিকার সলিল চৌধুরীর সাথে হেমন্তের ঐতিহাসিক মেলবন্ধন ঘটে। ১৯৪৮ সালের দিকে সলিল চৌধুরীর কথায় ও সুরে প্রায় ছয় মিনিটের আখ্যানধর্মী গান ‘কোনো এক গাঁয়ের বধূর কথা’ প্রকাশিত হয়, যা তৎকালীন বাংলা গানের প্রথাগত ধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। এরপর এই জুটির হাত ধরে ‘রানার’, ‘অবাক পৃথিবী’, ‘পাল্কীর গান’ এবং ‘গাঙচিল’-এর মতো কালজয়ী গণমুখী ও বাস্তবধর্মী গান সৃষ্টি হয়, যা তৎকালীন সমাজ ও সময়ের প্রতিচ্ছবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

উত্তম-হেমন্ত জুটি ও চলচ্চিত্র অধ্যায়

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অভিনেতা উত্তমকুমার এবং নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জুটি এক সোনালী যুগের সৃষ্টি করেছিল। ১৯৫৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘শাপমোচন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে এই সফল যাত্রার সূচনা হয়। পরবর্তীতে ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘মায়ামৃগ’, ‘ইন্দ্রাণী’, ‘জীবন তৃষ্ণা’ প্রভৃতি চলচ্চিত্রে উত্তমকুমারের ঠোঁটে হেমন্তের কণ্ঠ অনন্য উচ্চতা লাভ করে।

চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ১৯৫১ সালে পরিচালক হেমেন গুপ্তের আহ্বানে তিনি মুম্বাইয়ের হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে (বলিউড) পা রাখেন। সেখানে ‘আনন্দমঠ’ ছবির মাধ্যমে সুরকার হিসেবে যাত্রা শুরু করেন। ১৯৫৪ সালে ‘নাগিন’ চলচ্চিত্রের চমৎকার সংগীত পরিচালনার জন্য তিনি মর্যাদাপূর্ণ ‘ফিল্মফেয়ার পুরস্কার’ লাভ করেন। গায়ক হিসেবে হিন্দি চলচ্চিত্রে তাঁর গাওয়া ‘ইয়ে রাত ইয়ে চাঁদনী ফির কাহাঁ’, ‘হ্যায় আপনা দিল তো আওয়ারা’, এবং ‘না তুম হামে জানো’ অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর পদচারণা ছিল। ১৯৭২ সালে হলিউডের ইংরেজি চলচ্চিত্র ‘সিদ্ধার্থ’-এ তাঁর গাওয়া বিখ্যাত বাংলা গান ‘ও নদী রে’ এবং ‘পথের ক্লান্তি ভুলে’ ব্যবহার করা হয়, যা বিশ্ব দরবারে বাংলা গানকে পরিচিত করে তোলে।

রবীন্দ্রসংগীত ও জীবনাবসান

রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এক নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন। প্রথাগত ও জটিল ব্যাকরণের বাইরে এসে অত্যন্ত সহজ, সাবলীল ও আবেগঘন গায়কিতে তিনি রবীন্দ্রনাথের গানকে সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রোতাদের ড্রয়িংরুমে পৌঁছে দেন। তাঁর কণ্ঠে ‘আমার আর হবে না দেরি’, ‘কেন পান্থ এ চঞ্চলতা’, ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ’ এবং ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ রবীন্দ্রসংগীতের ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে গণ্য করা হয়।

বাংলা ও ভারতীয় সংগীতের এই মহান কিংবদন্তি ১৯৮৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।

ওস্তাদ ও কিংবদন্তি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জীবনপঞ্জি

সাল / সময়কালঐতিহাসিক ঘটনা এবং উল্লেখযোগ্য অর্জনসমূহ
১৬ জুন, ১৯২০ব্রিটিশ ভারতের বেনারসে জন্মগ্রহণ করেন।
১৯৩৫অল ইন্ডিয়া রেডিওতে (তৎকালীন ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন) অডিশনের মাধ্যমে সংগীতের আনুষ্ঠানিক সূচনা।
১৯৩৭প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড ‘জানিতে যদি গো তুমি’ এবং ‘বলো গো বলো মোরে’ প্রকাশ।
১৯৪৪নিজস্ব সুরে প্রথম সফল আধুনিক গান ‘কথা কয়ো নাকো, শুধু শোনো’ প্রকাশ।
১৯৪৮সলিল চৌধুরীর সুরে যুগান্তকারী গান ‘কোনো এক গাঁয়ের বধূর কথা’ রেকর্ড।
১৯৫১হিন্দি চলচ্চিত্র ‘আনন্দমঠ’-এর সুরকার হিসেবে মুম্বাইয়ে (বলিউড) আত্মপ্রকাশ।
১৯৫৪হিন্দি চলচ্চিত্র ‘নাগিন’-এর সংগীত পরিচালনার জন্য ‘ফিল্মফেয়ার পুরস্কার’ লাভ।
১৯৫৫‘শাপমোচন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ‘উত্তম-হেমন্ত’ কালজয়ী জুটির ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু।
১৯৭২কনরাড রুকস পরিচালিত হলিউড চলচ্চিত্র ‘সিদ্ধার্থ’-এ তাঁর বাংলা গান অন্তর্ভুক্ত।
২৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৯পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় এই মহান সুরসাধকের জীবনাবসান ঘটে।

মোহাম্মদ রাফি, কিশোর কুমার, মান্না দে কিংবা মুকেশের মতো সমসাময়িক কিংবদন্তিদের ভিড়েও হেমন্ত মুখোপাধ্যায় নিজের স্বতন্ত্র গায়কি, গভীর মমতাপূর্ণ কণ্ঠ এবং সুরের সহজাত আন্তরিকতার কারণে বাঙালির হৃদয়ে এক চিরস্থায়ী আসন লাভ করেছেন। যুগে যুগে তাঁর সৃষ্টি বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বেঁচে থাকবে।