জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

৮৫ যাত্রী নিয়ে পদ্মার ডুবোচরে আটকা পড়া লঞ্চ ৪ ঘণ্টা পর উদ্ধার

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাট থেকে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া একটি যাত্রীবাহী লঞ্চ নৌপথ ভুলে পদ্মা নদীর মাঝখানে এক বিশাল ডুবোচরে আটকে যায়। ‘এমভি বোয়ালি’ নামের ওই লঞ্চটিতে নারী ও শিশুসহ মোট ৮৫ জন যাত্রী ছিলেন। মাঝনদীতে চারদিক অন্ধকার থাকায় এবং লঞ্চটি চরে আটকে তীব্র ঝাঁকুনি খাওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

শনিবার (২৭ জুন) রাতের এই ঘটনার পর লঞ্চে থাকা যাত্রীরা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিয়ে জীবন বাঁচানোর আকুতি জানান। খবর পেয়ে দৌলতদিয়া ও পাটুরিয়া নৌ-পুলিশের দুটি উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। প্রায় ৪ ঘণ্টার যৌথ প্রচেষ্টায় সব যাত্রীকে অক্ষত ও নিরাপদে উদ্ধার করে পাড়ে পৌঁছে দেওয়া হয়।

মাঝনদীতে আতঙ্ক ও ৯৯৯-এর মাধ্যমে উদ্ধার অভিযান

নৌ-পুলিশ ও বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা যায়, শনিবার রাত পৌনে ৮টার দিকে দৌলতদিয়া লঞ্চ ঘাট থেকে ৮৫ জন যাত্রী নিয়ে এমভি বোয়ালি পাটুরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। কিন্তু নদীর মাঝপথে কুশাহাটা নামক স্থানে পৌঁছালে মাস্টার দিক গুলিয়ে ফেলেন। ফলে লঞ্চটি মূল চ্যানেল থেকে বিচ্যুত হয়ে অগভীর পানির একটি ডুবোচরে উঠে যায়।

লঞ্চে থাকা কুষ্টিয়ার যাত্রী তোফাজ্জল হোসেন সেই ভীতিকর পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে জানান, “আমরা ঢাকায় যাওয়ার জন্য রাতে লঞ্চে উঠেছিলাম। মাঝনদীতে যাওয়ার পর হঠাৎ বিকট শব্দে লঞ্চটি চরে আটকে যায় এবং জোরে ধাক্কা খায়। আলো বলতে শুধু লঞ্চের ভেতরের বাতিগুলো ছিল, বাইরে চারদিক অন্ধকার। আমরা সবাই তখন আতঙ্কে আল্লাহর নাম ডাকছিলাম। পরে আমাদের মধ্য থেকেই এক যাত্রী ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেন।”

দৌলতদিয়া নৌপুলিশ ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ত্রিনাথ সাহা জানান, রাত পৌনে ৮টার দিকে ফজলে রাব্বী ও মাসুম রানা নামে দুই যাত্রী ৯৯৯-এ ফোন দিয়ে তাঁদের বিপদের কথা জানান। বার্তাটি পাওয়ার পরপরই নৌ-পুলিশের টিম উদ্ধারকাজে নামে। পুলিশ সদস্যরা প্রথমে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার এবং দুটি শক্তিশালী স্পিডবোট নিয়ে চরে আটকে থাকা যাত্রীদের কাছে পৌঁছান এবং তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। পরবর্তীতে ‘এমভি চিশতিয়া’ নামের আরেকটি বড় লঞ্চ দুর্ঘটনাস্থলে এনে সব যাত্রীকে সাবধানে স্থানান্তর করা হয়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে যাত্রীদের নিয়ে চিশতিয়া লঞ্চটি পাটুরিয়া ঘাটে পৌঁছালে পরিস্থিতি শান্ত হয়। স্বস্তির বিষয় হলো, এই দীর্ঘ উৎকণ্ঠার মাঝে কোনো যাত্রী হতাহত হননি।

নাব্যতার সংকট নাকি চালকদের দিকভ্রান্তি?

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন বিআইডব্লিউটিএর দৌলতদিয়া ঘাটের টার্মিনাল সুপারভাইজার শিমুল ইসলাম। তবে এই দুর্ঘটনার পেছনে নৌপথের নাব্যতার সংকট নাকি চালকের ভুল ছিল, তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে।

বিআইডব্লিউটিএর আরিচা কার্যালয়ের নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের যুগ্ম পরিচালক আশরাফ উদ্দিন দাবি করেন, “নদীতে বা নৌপথে কোনো নাব্যতার সংকট নেই। লঞ্চের চালক বা মাস্টার দিক ভুল করে অগভীর পানিতে চলে গিয়েছিলেন বলেই লঞ্চটি চরে আটকে যায়।”

তবে ঘাট সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো ভিন্ন একটি সংকটের কথা তুলে ধরেছে। জানা গেছে, পাটুরিয়া লঞ্চ ঘাটটি সম্প্রতি নদীভাঙনের কবলে পড়ায় পন্টুনটি আগের স্থান থেকে সরিয়ে প্রায় ১ কিলোমিটার উজানে দাসকান্দি নামক স্থানে পুনস্থাপন করা হয়েছে। নতুন এই রুটে চলার সময় দৌলতদিয়ার কুশাহাটা চরের একটি অগভীর এলাকা পার হতে হয়। কিন্তু নতুন এই চ্যানেলে রাতে চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত বয়া, বাতি বা দিকনির্দেশক মার্কিং নেই। ফলে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা ও দিকনির্দেশনা না থাকায় লঞ্চের চালকরা প্রতিনিয়ত এক ধরনের ঝুঁকি নিয়েই এই রুটে নৌযান চালাচ্ছেন, যার ফলে শনিবার রাতের এই বিপত্তি ঘটেছে।

Tags :

Shourav Gurukul

Recent News