টানা কয়েকদিনের প্রবল বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের অন্যতম প্রধান পার্বত্য জেলা বান্দরবান। আবহাওয়াজনিত এই চরম পরিস্থিতিতে পর্যটক ও স্থানীয় জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে স্থানীয় জেলা প্রশাসন। গতকাল সোমবার রাতে জারি করা এক জরুরি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আজ মঙ্গলবার থেকে আগামী শুক্রবার (১০ জুলাই) পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ এই সময়ে পর্যটক, ট্যুর অপারেটরসহ সর্বসাধারণকে বান্দরবানের যেকোনো দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার জন্য কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জানমালের নিরাপত্তায় জেলা প্রশাসনের জরুরি নির্দেশনা
বান্দরবান পার্বত্য জেলার জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস স্বাক্ষরিত ওই জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে জেলায় অব্যাহত ভারী বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ি রাস্তাগুলোতে ধস এবং নদী ও ঝরনাগুলোর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
সম্ভাব্য বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ও সার্বিক নিরাপত্তা বিবেচনায় ১০ জুলাই পর্যন্ত জেলার সমস্ত পর্যটনকেন্দ্র, ঝরনা, পাহাড়ি ট্রেইল, নদীপথ ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যাতায়াত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সাথে সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের এই নির্দেশনা যথাযথভাবে প্রতিপালন করতে এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
পাহাড়ি ঢলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, থানচিতে নৌকাডুবি
টানা দুই দিনের প্রবল বর্ষণের ফলে বান্দরবানের থানচি ও আলীকদম উপজেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তোড়ে এই দুই উপজেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র থেকে জানা গেছে, থানচির দুর্গম তিন্দু এলাকায় পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতের কারণে গত সোমবার একটি নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। তবে সৌভাগ্যবশত নৌকার আরোহীরা সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হওয়ায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। অন্যদিকে, আলীকদম উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় শত শত একর ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে, যার ফলে ব্যাপক ফসলহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এছাড়া বেশ কিছু ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন। অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে শুরু করেছেন।
আবহাওয়া দপ্তরের সতর্কবার্তা ও ভূমিধসের আশঙ্কা
দেশের আবহাওয়া পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক ভারী বৃষ্টিপাতসংক্রান্ত এক বিশেষ সতর্কবার্তায় জানিয়েছেন, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে একটি মৌসুমি নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছে। এই নিম্নচাপের সক্রিয় প্রভাবে গত রোববার (৫ জুলাই) থেকে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত দেশের প্রায় সব বিভাগেই ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।
বিশেষ সতর্কবার্তা: আবহাওয়া দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও এই অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে। বিশেষ করে অতিবৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকা, বিশেষ করে বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ ভূমিধসের (Landslide) প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী নাগরিকদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় কন্ট্রোল রুম খোলাসহ সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।









