ধামইরহাটে মাকে নির্যাতন: দুই ছেলে গ্রেপ্তার ও কারাগারে

নওগাঁর ধামইরহাটে সম্পত্তি নিজের নামে লিখে না দেওয়ায় চাঁদ সুলতানা (৬৫) নামের এক বৃদ্ধা মাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগে তাঁর দুই ছেলেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আজ রোববার দুপুরে ধামইরহাট থানা-পুলিশ উপজেলার খড়মপুর গ্রাম থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর যাবতীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বিকেলে আদালতের মাধ্যমে আসামিদের নওগাঁ জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

ঘটনার বিবরণ ও পারিবারিক পটভূমি

ভুক্তভোগী চাঁদ সুলতানা নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলার খড়মপুর গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি দুই ছেলের সঙ্গেই বসবাস করতেন। গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা হলেন—চাঁদ সুলতানার বড় ছেলে আবদুল মমিন (৪৫) এবং তাঁর ছোট ছেলে আবদুল মুকিম (৩৫)।

স্থানীয় সূত্র এবং পুলিশি তদন্ত থেকে জানা গেছে, চাঁদ সুলতানার স্বামীর মৃত্যুর পর দুই ছেলে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই মমিন ও মুকিম তাঁদের পরিবার নিয়ে মায়ের থেকে আলাদাভাবে নিজস্ব সংসার পরিচালনা করতে শুরু করেন। পৃথকভাবে বসবাস শুরু করলেও দুই ছেলের দৃষ্টি পড়ে মায়ের নামে থাকা স্থাবর সম্পত্তির ওপর। তাঁরা মায়ের মালিকানাধীন কিছু সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখে নেওয়ার জন্য চাঁদ সুলতানার ওপর অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন।

মায়ের পক্ষ থেকে সম্পত্তি লিখে দিতে অস্বীকৃতি জানানো হলে পারিবারিক পরিমণ্ডলে এক তীব্র বিরোধের সৃষ্টি হয়। এই জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে ছেলেরা প্রায়শই বৃদ্ধা মাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতেন এবং সুযোগ বুঝে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন চালাতেন।

নির্যাতনের তীব্রতা ও থানায় লিখিত অভিযোগ

পারিবারিক ও স্থানীয়ভাবে এই বিরোধ সুরাহা করার জন্য একাধিকবার চেষ্টা করা সত্ত্বেও দুই ছেলের আচরণে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। বরং দিন দিন নির্যাতনের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পেতে থাকে। গতকাল শনিবার দুই ছেলে তাঁদের বৃদ্ধা মায়ের ওপর আবারও চড়াও হন। তাঁরা সম্পত্তি লিখে দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগের একপর্যায়ে মাকে নির্মমভাবে মারধর করেন এবং বাড়ি থেকে জোরপূর্বক বের করে দেওয়ার চেষ্টা চালান।

ছেলেরা বাড়ি থেকে তাріїয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে বৃদ্ধা চাঁদ সুলতানা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন এবং নিরুপায় হয়ে তাঁর কন্যাসন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ধামইরহাট থানায় উপস্থিত হন। সেখানে তিনি বড় ছেলে আবদুল মমিন ও ছোট ছেলে আবদুল মুকিমের বিরুদ্ধে আইনগত প্রতিকার চেয়ে বিকেলে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

পুলিশের তদন্ত, গ্রেপ্তার ও বিচারিক প্রক্রিয়া

canবৃদ্ধা মায়ের লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর ধামইরহাট থানা-পুলিশ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেয়। নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, অভিযোগ প্রাপ্তির পরপরই ধামইরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিন্টু রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি বিশেষ দল খড়মপুর গ্রামে ভুক্তভোগীর বাড়িতে পাঠানো হয়।

ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যরা স্থানীয় প্রতিবেশী এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও স্থানীয়দের বক্তব্যে বৃদ্ধা চাঁদ সুলতানার ওপর তাঁর দুই ছেলের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পর আজ রোববার দুপুরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত দুই ভাই আবদুল মমিন ও আবদুল মুকিমকে খড়মপুর গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।

গ্রেপ্তারের পর ধামইরহাট থানায় তাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করা হয়। এরপর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া ও দাপ্তরিক নথিপত্র প্রস্তুত শেষে আজ বিকেলেই দুই ভাইকে নওগাঁর সংশ্লিষ্ট আদালতে সোপর্দ করা হয়। আদালত পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিলে পুলিশ আসামিদের জেলা কারাগারে নিয়ে যায়।