চট্টগ্রাম নগরের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা মোকাবিলায় আরও দুটি নতুন প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প দুটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮৭১ কোটি টাকা। তবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) চূড়ান্ত হওয়ার পর ব্যয়ের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।
গত বুধবার নগরের টাইগারপাসে সিটি করপোরেশনের অস্থায়ী প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক উপস্থাপনায় প্রকল্প দুটির প্রাথমিক ব্যয়, কাঠামো ও সম্ভাব্য কার্যক্রম তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন। এছাড়া প্রকৌশলী ও বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বর্তমানে প্রকল্প দুটির প্রাক্-উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (পিডিপিপি) প্রস্তুত করছে।
সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, প্রকল্পগুলোর প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এখন বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সংযোজন করা হবে। চলতি মাসের মধ্যেই ডিপিপি চূড়ান্ত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। অনুমোদনের পরবর্তী ধাপগুলো সম্পন্ন হলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্প দুটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে।
চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি
চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে বর্তমানে চারটি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে দুটি পরিচালনা করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), একটি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং একটি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। গত ৮ থেকে ১০ বছর ধরে প্রকল্পগুলোর কাজ চলমান রয়েছে।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| চলমান প্রকল্পের সংখ্যা | ৪টি |
| মোট ব্যয় | ১৪,৩৮৯ কোটি টাকা |
| মার্চ পর্যন্ত ব্যয় | ১০,৪০৮ কোটি টাকা |
| নতুন প্রকল্পের সংখ্যা | ২টি |
| নতুন প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় | ৩,৮৭১ কোটি টাকা |
৩৬ খালের রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা
নতুন প্রকল্পগুলোর একটি হবে বর্তমানে সিডিএর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতাভুক্ত ৩৬টি খালের রক্ষণাবেক্ষণ, পুনঃখনন, বর্জ্য অপসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২২ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
এই ৩৬টি খালের মোট দৈর্ঘ্য ১১০ দশমিক ৩৩ কিলোমিটার। খালগুলোর দৈর্ঘ্য আধা কিলোমিটার থেকে ছয় কিলোমিটার পর্যন্ত, যদিও কিছু খাল এর চেয়েও দীর্ঘ। বর্তমানে খালগুলোর গড় গভীরতা শূন্য দশমিক ৮ মিটার থেকে আড়াই মিটার পর্যন্ত রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১৬ লাখ ঘনমিটার পলি উত্তোলনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রথম বছরেই ১১২ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় খাল পুনঃখনন, পলি অপসারণ, বর্জ্য পরিবহন, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, খালের সীমানা সুরক্ষা এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনার কাজ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তবে সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু সাদাত মোহাম্মদ তৈয়ব জানিয়েছেন, বর্তমান ব্যয় পুনর্বিবেচনা করা হবে। তাঁর মতে, কিছু খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ এখনও যথেষ্ট নয় এবং চূড়ান্ত ব্যয় এক হাজার থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
২১ খালের উন্নয়ন ও সংস্কার
দ্বিতীয় প্রকল্পটি নেওয়া হচ্ছে সিডিএর চলমান প্রকল্পের বাইরে থাকা ২১টি খালকে কেন্দ্র করে। এসব খালের মোট দৈর্ঘ্য ৩৪ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার। প্রকল্পটির প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা।
এই প্রকল্পের আওতায় খাল সংস্কার ও উন্নয়নের পাশাপাশি খালের দুই পাশে প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ করা হবে। এছাড়া জমি অধিগ্রহণ, জোয়ার প্রতিরোধক ফটক (টাইডাল রেগুলেটর) ও পাম্প স্টেশন স্থাপন, বিভিন্ন সেবা সংস্থার পাইপলাইন স্থানান্তর, সড়ক উন্নয়ন, পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা, জিআইএস কার্যক্রম এবং সৌন্দর্যবর্ধনের কাজও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
| ব্যয়ের খাত | প্রস্তাবিত ব্যয় |
|---|---|
| খাল উন্নয়ন ও সংস্কার | ২,৫৭৮ কোটি টাকা |
| জমি অধিগ্রহণ | ৫৮ কোটি টাকা |
| টাইডাল রেগুলেটর ও পাম্প স্টেশন | ৫৭ কোটি টাকা |
| পাইপলাইন স্থানান্তর ও সড়ক | ৩৭ কোটি টাকা |
| পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও জিআইএস | ৫৩ কোটি টাকা |
| সৌন্দর্যবর্ধন | ৭৭ কোটি টাকা |
জলাবদ্ধতা বিষয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার ও শাহরিয়ার খালেদের মতে, নগরে এই ২১টি খালের বাইরেও আরও খাল রয়েছে। জলাবদ্ধতা সমস্যার কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করতে হলে সেসব খালকেও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।
মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, চলমান কিছু কাজের সুফল পাওয়ায় চলতি বর্ষায় চট্টগ্রাম তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়ক অবস্থায় থাকতে পারে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু খাল পরিষ্কার করাই যথেষ্ট নয়; খাল সচল রাখা, দখলমুক্ত করা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর মতে, খাল, নালা, ড্রেন, স্লুইসগেট, খাল দখল এবং খালের প্রস্থ কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিয়েই স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি আরও জানান, ৩৬ খালের রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পের ব্যয় এবং ২১ খালভিত্তিক উন্নয়ন প্রকল্প—উভয় ক্ষেত্রেই পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। পাশাপাশি তালিকার বাইরে থাকা খালগুলোও যাচাই-বাছাই করে প্রকল্পের আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। তাঁর মতে, এমন খালের সংখ্যা ৪০ থেকে ৫০টির মধ্যে হতে পারে।