গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আকস্মিকভাবে সংঘাত শুরু হওয়ার পর কৌশলগত ও বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক রুট হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এই সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে আরব উপসাগরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মোট ১০৯টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেল ট্যাংকার আটকা পড়ে। তবে সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর বিশেষ পরোক্ষ সহায়তায় এই দীর্ঘ অবরুদ্ধ দশা থেকে ২৯টি বড় তেল ট্যাংকার ও মালবাহী জাহাজ নিরাপদে প্রণালি পার হয়ে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে।
এই সফল প্রস্থানের পর আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি ও বৈশ্বিক জাহাজ মালিকদের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পুনরায় নৌযান চলাচলের বিষয়ে নতুন করে প্রত্যাশা ও আশার আলো বাড়ছে।
Table of Contents
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের ভূমিকা ও পরামর্শ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আন্তর্জাতিক শিপিং খাতের একাধিক জাহাজ মালিক জানিয়েছেন, সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ এই পরিস্থিতিতে তারা মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। মার্কিন বাহিনী তাদের নিরাপদে প্রণালি পার হওয়ার বিষয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে।
তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) একজন মুখপাত্র এই বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদ বা যুদ্ধজাহাজগুলো সরাসরি বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে কোনো ধরনের এসকর্ট বা সশরীরে পাহারা দিচ্ছে না; বরং তারা কেবল নৌযানগুলোকে সমুদ্রের নিরাপদ রুট ব্যবহারের বিষয়ে এবং ঝুঁকি এড়াতে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনামূলক পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।
ইরানি স্পিডবোটের তাড়া ও মার্কিন হেলিকপ্টারের হস্তক্ষেপ
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের সময় সশরীরে উপস্থিত এক প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তি জানান, প্রণালি পার হওয়ার সময় একদল বাণিজ্যিক জাহাজের দিকে ইরানের সন্দেহভাজন কিছু দ্রুতগতির স্পিডবোট অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে ধেয়ে আসছিল। তবে আকস্মিকভাবে সেখানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি হেলিকপ্টার হাজির হলে ইরানি স্পিডবোটগুলো তাৎক্ষণিকভাবে পিছু হটতে বাধ্য হয়। এর ফলে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই নিরাপদে তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যায়।
অন্য এক বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি শেভরনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাইক ওয়ার্থও নিশ্চিত করেছেন যে, সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রণালি পার হতে যাওয়া কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ বিভিন্ন ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত আক্রমণের মুখে পড়েছে। উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রশাসন থেকে কঠোর সতর্কবার্তা জারি করে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদে যাতায়াত নিশ্চিত করার জন্য ইরানের সঙ্গে কোনো ধরনের দ্বিপাক্ষিক আর্থিক চুক্তি করা বা ইরানকে কোনো টোল বা কর দেওয়া সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।
লোকেশন ট্র্যাকার বন্ধ এবং নৌ-চলাচলের বর্তমান চিত্র
ব্লুমবার্গের বিশেষ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে রোববার (৩১ মে) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক গণমাধ্যম ‘দ্য ন্যাশনাল’ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যে সকল শিপিং কোম্পানি এই রুটটি পুরোপুরি পরিহার বা বর্জন করেছিল, মার্কিন সহায়তার পর তাদের অনেকেই এখন পুনরায় এই পথে যাতায়াত শুরু করেছে। বর্তমানে কিছু জাহাজ শুধু অবরুদ্ধ দশা থেকে বেরই হচ্ছে না, বরং নতুন করে বেশ কিছু জাহাজ আরব উপসাগরে প্রবেশও করছে।
তবে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে চলাচল করা কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের স্যাটেলাইট ট্রান্সপন্ডার বা লোকেশন ট্র্যাকার সম্পূর্ণ বন্ধ করে যাত্রা পরিচালনা করছে। এর ফলে প্রথাগত জাহাজ ট্র্যাকিং ডেটা বা স্যাটেলাইট চিত্রে প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে অনেক কম জাহাজ দৃশ্যমান হচ্ছে।
বিশ্ববাজার ও ট্যাংকার ভাড়ার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে এই নৌ-চলাচল ব্যবস্থা নিয়মিত বজায় থাকে, তবে বিশ্ববাজারে তেল, গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করবে। এটি বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের সংকট অনেকাংশে কমিয়ে আনবে।
এদিকে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ট্যাংকার্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গেরাসিমোস কালোজিরাতোস এই পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ প্রভাব নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, প্রণালিটি যদি আন্তর্জাতিক যাতায়াতের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, তবে প্রাথমিক বা প্রথম দিকে জাহাজ চলাচলের একটি প্রবল উদ্দীপনা ও গতি দেখা যাবে। তবে বর্তমান বৈশ্বিক তেলের যে মজুত ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা পূরণের চাহিদার কারণে দীর্ঘ মেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের ট্যাংকারের ভাড়ার খরচ উচ্চ বা চড়া থাকবে।
