৫৭ বছর পর অবসরে যাচ্ছেন সমর্থক জলিল চাচা

ক্রিকেট অঙ্গনে খেলোয়াড়দের বয়স বা ফর্মের কারণে একটা নির্দিষ্ট সময় পর অবসরে যাওয়ার নিয়মিত ঘটনা দেখা গেলেও, কোনো একনিষ্ঠ সমর্থকের অবসরের সিদ্ধান্ত সচরাচর শোনা যায় না। তবে সেই সমর্থক যদি হন দীর্ঘ অর্ধ-শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দলের সুখ-দুঃখের সঙ্গী, তবে তাঁর বিদায় নেওয়ার খবরটি ক্রিকেট বিশ্বে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। পাকিস্তান ক্রিকেট দলের এমনই এক কিংবদন্তিতুল্য ও অবিচ্ছেদ্য সমর্থক চৌধুরী আবদুল জলিল, যিনি ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত ও জনপ্রিয় ‘জলিল চাচা’ নামে। দীর্ঘ ৫৭ বছর ধরে গ্যালারি থেকে অকৃত্রিম ভালোবাসায় পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে অবিরাম সমর্থন জুগিয়ে আসা এই প্রবীণ সমর্থক অবশেষে ক্রিকেট গ্যালারি থেকে আনুষ্ঠানিক অবসরে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।

বিশ্বের নানা প্রান্তে পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক ম্যাচ মানেই গ্যালারিতে জলিল চাচার এক চিরচেনা ও বর্ণিল উপস্থিতি। শরীরে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকার সবুজ ও সাদা রঙের আদলে তৈরি বিশেষ গাঢ় সবুজ রঙের কুর্তা, মাথায় টুপি এবং হাতে দেশের জাতীয় পতাকা—এই স্বতন্ত্র ও নিজস্ব ঘরানার স্টাইলে যুগ যুগ ধরে তিনি গ্যালারি কাঁপিয়েছেন। তবে দীর্ঘদিনের এই চেনা দৃশ্যপট আর বেশিদিন ক্রিকেট মাঠে দেখা যাবে না। পাকিস্তান ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার আসন্ন ওয়ানডে বা একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সিরিজ শুরু হতে যাচ্ছে। এই দ্বিপাক্ষিক সিরিজের শেষ ম্যাচটিই হবে পাকিস্তানের মাটিতে জলিল চাচার গ্যালারিতে উপস্থিত থাকার শেষ সুযোগ। এরপর आगामी আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে ইংল্যান্ড সফরে পাকিস্তান ক্রিকেট দলের যে টেস্ট সিরিজ নির্ধারিত রয়েছে, সেটিই হবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে গ্যালারি থেকে তাঁর পতাকা নাড়ানোর এবং দলকে সমর্থন দেওয়ার সর্বশেষ ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

দীর্ঘ পথচলার সূচনা, শারজার স্মৃতি ও তারকাখ্যাতি

চৌধুরী আবদুল জলিল তথা জলিল চাচার এই দীর্ঘ ক্রিকেটীয় সমর্থনের যাত্রাটি শুরু হয়েছিল আজ থেকে কয়েক দশক আগে। ১৯৬৮-৬৯ মৌসুমে ইংল্যান্ড ক্রিকেট দল যখন পাকিস্তান সফরে এসেছিল, তখন লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত একটি ম্যাচ গ্যালারিতে বসে প্রথমবার প্রত্যক্ষ করেছিলেন তিনি। সেই ম্যাচের পর থেকেই ক্রিকেট এবং পাকিস্তান দলকে সমর্থন করা তাঁর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য এবং পরম অংশে পরিণত হয়।

পরবর্তীতে গত শতাব্দীর আশি ও নব্বইয়ের দশকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের ম্যাচগুলোতে নিজের বিশেষ পোশাক ও ব্যতিক্রমী স্টাইলে সমর্থন জানিয়ে তিনি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি ও নজর কাড়তে শুরু করেন। ক্রমান্বয়ে তিনি বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে চেনা মুখ এবং একজন তারকা সমর্থক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। সেই সময় পর্যন্ত তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি সাধারণ চাকরি করতেন। তবে পাকিস্তান দলের প্রতি ভালোবাসার টানে একপর্যায়ে তিনি সেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে পূর্ণকালীন সমর্থক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, স্পনসর ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের আর্থিক সহায়তায় তিনি এক স্টেডিয়াম থেকে অন্য স্টেডিয়ামে, এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাকিস্তান দলের খেলা দেখতে ছুটে বেরিয়েছেন।

জীবনের লক্ষ্য পূরণ এবং ভবিষ্যৎ জাদুঘরের পরিকল্পনা

canনে ৭৭ ছুঁই ছুঁই বয়সে এসে এই দীর্ঘ ও অক্লান্ত পথচলার ইতি টানতে যাচ্ছেন জলিল চাচা। জীবনের এই অপরাহ্নে এসে তিনি নিজ শহর শিয়ালকোটের উপকণ্ঠে একটি রেস্তোরাঁ এবং একটি ব্যক্তিগত জাদুঘর বা মিউজিয়াম খোলার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ করতে চান। ক্রিকেট বিষয়ক আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইট ইএসপিএন ক্রিকইনফো (ESPNcricinfo)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের এই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করেছেন।

জলিল চাচা জানিয়েছেন, দীর্ঘ ৫৭ বছরের ক্রিকেট সফরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করা খেলোয়াড়দের অটোগ্রাফ, জার্সি, টুпи ও বিভিন্ন নান্দনিক স্মৃতিচিহ্ন তিনি এই জাদুঘরে সাধারণ দর্শক ও ক্রিকেটপ্রেমীদের প্রদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করে রাখবেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল অন্তত ৫০০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে মাঠে উপস্থিত থেকে সরাসরি পাকিস্তানকে সমর্থন করা, যা তিনি ইতিমধ্যেই সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছেন। মাঠে তারকাদের জন্য গলা ফাটিয়ে সমর্থন করতে গিয়ে জলিল চাচা নিজেও পাকিস্তানে একজন বড় তারকা বা সেলিব্রিটিতে পরিণত হয়েছেন। দেশের স্থানীয় বিভিন্ন ঘরোয়া ক্রিকেট ম্যাচ, টেপ টেনিস টুর্নামেন্ট থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, বিয়ে কিংবা জনকল্যাণমূলক আয়োজনে তাঁর উপস্থিতি বিশেষভাবে কাম্য থাকে। অবসরের পর এই তারকাখ্যাতি ও পরিচিতিকে তিনি মানুষের সেবায় এবং জনকল্যাণমূলক কাজে উৎসর্গ করতে চান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন যে, তিনি কেবল দেশ এবং ক্রিকেটের প্রতি নিছক ভালোবাসা থেকেই সবকিছু করেছেন এবং তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের একজন মহান দূত বা অ্যাম্বাসেডর হওয়া এবং সব দলের সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটানো।

স্মরণীয় ম্যাচের স্মৃতিচারণ ও বর্তমান দলের সংকট

জলিল চাচার স্মৃতিতে সেরা দুই ম্যাচ:

  • ১৯৮৬ সালের শারজা কাপ: ভারত বনাম পাকিস্তানের মধ্যকার ঐতিহাসিক ম্যাচ, যেখানে জাভেদ মিয়াঁদাদ ভারতীয় বোলার চেতন শর্মার শেষ বলে ছক্কা মেরে পাকিস্তানকে অবিস্মরণীয় জয় এনে দিয়েছিলেন। জলিল চাচা স্পষ্টভাবে মনে করতে পারেন যে, মিয়াঁদাদ সেই বলটি ডিপ মিডউইকেটের ওপর দিয়ে সীমানা পার করেছিলেন।

  • ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি: ইংল্যান্ডের ওভাল মাঠে অনুষ্ঠিত আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে হারিয়ে পাকিস্তানের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরবময় মুহূর্ত।

বর্তমান দলের সংকট ও শেষ বার্তা

বর্তমানে পাকিস্তান জাতীয় ক্রিকেট দল মাঠের পারফরম্যান্সে অত্যন্ত প্রতিকূল ও বাজে সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৩ সালের পর থেকে তারা বিদেশের মাটিতে কোনো টেস্ট ম্যাচ জিততে সমর্থ হয়নি এবং সর্বশেষ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে দুটি টেস্ট ম্যাচের সিরিজে ঘরের মাঠে ধবলধোলাই বা হোয়াইটওয়াশ হয়েছে। আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের গত চক্রে তাদের অবস্থান ছিল পয়েন্ট তালিকার একেবারে তলানিতে। এছাড়া সাদা বলের ক্রিকেটে সর্বশেষ চারটি আইসিসি টুনামেন্টের নকআউট বা সেমিফাইল পর্বেও উঠতে ব্যর্থ হয়েছে দলটি।

দলের এমন বিপর্যয় ও ধারাবাহিক ব্যর্থতায় জলিল চাচা স্বাভাবিকভাবেই গভীরভাবে হতাশ। তবে মাঠের এই দুঃসময়েও তিনি পাকিস্তান দলের ঘুরে দাঁড়ানোর আশা পুরোপুরি ছেড়ে দেননি। এই পরাজয়কে খেলারই একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে বিবেচনা করে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন যে, খেলায় কখনো জয় আসবে, আবার কখনো পরাজয় আসবে; এর মধ্যেই সুখ-দুঃখের মুহূর্তগুলোকে মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।