কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে নগদ টাকার চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পেলেও দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম (ATM) বুথগুলোতে টাকা উত্তোলনে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন গ্রাহকরা। গত সোমবার থেকে শুরু হওয়া টানা সাত দিনের সরকারি ছুটিতে অনেক বুথেই পর্যাপ্ত নগদ অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও আবার অন্য ব্যাংকের কার্ড দিয়ে টাকা উত্তোলনের সুবিধা সীমিত বা পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে পশু কেনা ও ঈদের কেনাকাটার এই সময়ে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, মূলত দুটি প্রধান কারণে বর্তমানে এটিএম সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। প্রথমত, ঈদের ছুটিতে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের চাহিদার বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয়ত, নতুন গভর্নরের স্বাক্ষর সংবলিত ব্যাংক নোট ব্যবহারের কারণে এটিএম যন্ত্রগুলোতে যান্ত্রিক জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
এটিএম সংকটের মূল কারণসমূহ
তারল্য ও নোটের স্বল্পতা: ডাচ্-বাংলা, ব্র্যাক, দি সিটি এবং ইসলামী ব্যাংকের মতো বড় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঈদের বিশেষ চাহিদার জন্য তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে যে পরিমাণ অর্থ চেয়েছিলেন, তার পুরোটা সরবরাহ করা হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের বুথগুলোতে দৈনিক প্রায় ১,০০০ কোটি টাকার চাহিদা থাকলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই পরিমাণ অর্থ জোগান দিতে পারেনি।
নতুন নোটের যান্ত্রিক অসংগতি: বাজারে সম্প্রতি নতুন গভর্নরের স্বাক্ষর করা নোট ছাড়া হয়েছে। যদিও নোটের নকশা অপরিবর্তিত রয়েছে, তবুও সফটওয়্যারের মাধ্যমে এই নোটগুলোকে যন্ত্রের উপযোগী বা ‘রিকগনাইজ’ করতে নির্দিষ্ট সময়ের প্রয়োজন হয়। সাধারণত এটিএম যন্ত্রকে নতুন নোটের সাথে পরিচিত করাতে চার সপ্তাহ সময় লাগলেও এবার সেই সময় পাওয়া যায়নি। ফলে যন্ত্রগুলো নতুন নোট শনাক্ত করতে না পেরে অনেক ক্ষেত্রে টাকা আটকে যাচ্ছে।
ব্যাংকিং সেবা ও বর্তমান পরিস্থিতির পরিসংখ্যান
নিচে এটিএম বুথের বর্তমান অবস্থা এবং লেনদেনের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | বিবরণ |
| চাহিদার ধরণ | কোরবানির পশু ক্রয় ও উৎসবকালীন ব্যয় বৃদ্ধি। |
| টাকা উত্তোলনের সমস্যা | বুথে নগদের অভাব ও আন্তঃব্যাংক লেনদেন সীমিতকরণ। |
| বড় ব্যাংকের দৈনিক চাহিদা | প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা (ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের উদাহরণ)। |
| নতুন নোটের জটিলতা | গভর্নরের স্বাক্ষর পরিবর্তনের কারণে যন্ত্রের শনাক্তকরণ সমস্যা। |
| কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা | সার্বক্ষণিক পর্যাপ্ত টাকা রাখা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ। |
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ডিজিটাল লেনদেন ও এটিএম সেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ব্যাংকগুলোকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, ব্যাংকগুলোকে যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বুথগুলোতে পর্যাপ্ত অর্থ সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং অধিকাংশ বুথে লেনদেন সচল রাখার চেষ্টা চলছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ঈদের আগে দ্রুততার সাথে নতুন নোট বাজারে আসায় এটিএম যন্ত্রের সেন্সরগুলো সেগুলো গ্রহণ করতে পারছে না। যেহেতু নতুন স্বাক্ষরযুক্ত নোটের কনফিগারেশন আপডেট করার পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়নি, তাই এই সংকট তৈরি হয়েছে। ব্যাংক কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করেছেন যে, ঈদের ছুটির পর যান্ত্রিক এই ত্রুটিগুলো দ্রুত সংশোধন করা সম্ভব হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ গ্রাহকদের ভোগান্তি নিরসনে বিকল্প ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
