বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক বৈদেশিক মুদ্রায় স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্য অর্থায়নের ওপর আরোপিত সর্বোচ্চ তিন শতাংশের সুদের সীমা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন অফ ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ’ (এবিবি)। সংগঠনটির পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। ব্যাংকারদের হুঁশিয়ারি অনুযায়ী, সুদের এই নতুন সীমার কারণে ব্যাংকগুলোর পক্ষে বাণিজ্য অর্থায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা বাণিজ্যিকভাবে লোকসান বা অলাভজনক হয়ে পড়তে পারে, যা দেশের সামগ্রিক আমদানি ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত করবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকে প্রেরিত আবেদন ও সুদের হারের ব্যবধান
গত ১৪ মে ২০২৬ তারিখে এবিবি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে একটি লিখিত চিঠি পাঠিয়ে এই সুদের হার সংশোধনের অনুরোধ জানায়। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রায় বাণিজ্য অর্থায়নের সর্বোচ্চ সুদের হার ‘সিকিউরড ওভারнайট ফাইন্যান্সিং রেট’ (সোফর) প্লাস চার শতাংশ থেকে কমিয়ে ‘সোফর’ প্লাস তিন শতাংশ নির্ধারণ করে দেয়।
এই নতুন প্রজ্ঞাপনের পূর্বে ব্যাংকগুলো ‘ইউজান্স পেবল অ্যাট সাইট’ (ইউপিএস) ঋণপত্রের বিপরীতে প্রায় ৭.৫১ শতাংশ হারে সুদ আদায় করতে পারতো। নতুন নিয়ম চালুর পর এই সুদের হার কমে দাঁড়াবে প্রায় 6.৫১ শতাংশে। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলো দেশীয় মুদ্রায় বা টাকায় ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত সুদ আদায় করতে পারে। শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, সুদের হার কমলে আমদানিকারকদের খরচ কমবে। তবে ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মতে, বাণিজ্য অর্থায়ন সংকুচিত হলে আমদানিকারকেরা বাজার থেকে সরাসরি ডলার কিনতে বাধ্য হবেন, যা ব্যাংকিং খাতে তারল্যের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
নিচে দেশীয় মুদ্রা ও বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থায়নের সুদের হারের একটি তুলনামূলক চিত্র ছকের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| অর্থায়নের মাধ্যম ও ধরণ | পূর্ববর্তী সর্বোচ্চ সুদের হার | বর্তমান সংশোধিত সুদের হার | স্থানীয় মুদ্রায় সুদের হার |
| বৈদেশিক মুদ্রায় বাণিজ্য অর্থায়ন (ইউপিএস ঋণপত্র) | সোফর + ৪% (প্রায় ৭.৫১%) | সোফর + ৩% (প্রায় ৬.৫১%) | প্রযোজ্য নয় |
| স্থানীয় মুদ্রা বা টাকায় অর্থায়ন | প্রযোজ্য নয় | প্রযোজ্য নয় | ১২% থেকে ১৩% |
ব্যয় বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থার নেতিবাচক পূর্বাভাস
বিভিন্ন বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরা জানিয়েছেন যে, নতুন নির্ধারিত সুদের সীমার মধ্যে লাভজনকভাবে এই ব্যবসা পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন। ব্যাংকগুলোর অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট বা বহিঃস্থ ব্যাংকিং শাখাগুলো বিদেশি ঋণদাতাদের কাছ থেকে সাধারণত ‘সোফর’ প্লাস ২.৫০% থেকে ২.৭৫% হারে তহবিল সংগ্রহ করে। এর সাথে সংবিধিবদ্ধ তারল্য সুরক্ষার খরচ যোগ করার পর কার্যকর তহবিল খরচ দাঁড়ায় প্রায় ‘সোফর’ প্লাস ২.৮০%। ফলে তিন শতাংশের সীমা বহাল থাকলে ব্যাংকগুলোর মুনাফার মার্জিন বা প্রান্তিক লাভ ব্যাপকভাবে কমে যাবে। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে প্রতি ডলারে অন্তত এক টাকা লাভ থাকা আবশ্যক।
আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থা ‘ফিচ রেটিংস’ সম্প্রতি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা মূল্যায়নে দেশের অবস্থান ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ হিসেবে পরিবর্তন করেছে, যদিও তাদের ‘বি প্লাস’ রেটিং অপরিবর্তিত রয়েছে। এই নেতিবাচক পূর্বাভাস ও মূল্যায়নের কারণে বিদেশি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থায়ন সম্প্রসারণে অনীহা প্রকাশ করছে এবং ঋণপত্রের নিশ্চয়তা বা কনফার্মেশন চার্জ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর ফলে বিদেশি ব্যাংকগুলো তহবিল সরবরাহের জন্য সরাসরি তিন শতাংশ সুদ দাবি করতে পারে। এমন परिस्थितियोंতে দেশীয় ব্যাংকগুলো ডলারে ঋণ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে গ্রাহকদের স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ নিতে বাধ্য করতে পারে, যা বাজারে অর্থ সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।
এবিবির চিঠিতে উল্লেখিত সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাবসমূহ
এবিবি তাদের পত্রে এই সুদের সীমা কার্যকর হওয়ার ফলে অর্থনীতিতে বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছে:
বিনিময় হারের ওপর চাপ: ডলারের ঋণ কমে গেলে আমদানিকারকেরা ডলার ক্রয়ের জন্য টাকার ঋণের দিকে ঝুঁকবেন, যা বাজারে ডলারের স্বল্পমেয়াদি চাহিদা বাড়িয়ে বিনিময় হারকে ঊর্ধ্বমুখী করবে।
স্থানীয় সুদের হার বৃদ্ধি: টাকার ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়লে স্থানীয় মুদ্রার সুদের সামগ্রিক কাঠামো ওপরের দিকে ধাবিত হবে এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।
বিদেশি তহবিলের সংকোচন: আন্তর্জাতিক ঋণদাতারা এই নতুন সীমার মধ্যে মুনাফা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কায় বাংলাদেশ বাজারে অর্থায়নের পরিমাণ কমিয়ে দিতে পারে, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থার তারল্যকে আরও সংকটাপন্ন করবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন এই বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন যে, সুদের হার বেঁধে দেওয়ার এই সিদ্ধান্তের ফলে বৈদেশিক অর্থায়নের উৎসগুলো ধীরে ধীরে শুকিয়ে যেতে পারে। যেহেতু কোনো প্রতিষ্ঠান লোকসান দিয়ে এই সেবা সচল রাখবে না, তাই বিদেশি তহবিলের প্রবাহ কমে যাবে এবং আমদানিকারকেরা স্থানীয় বাজার থেকে ডলার কিনতে বাধ্য হবেন, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জানিয়েছেন, এবিবির চিঠিটি পর্যালোচনা করে এই বিষয়ে পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রদান করা হবে।
