দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের লেলিহান শিখা নিভে যাওয়ার পর বিশ্ব যখন ধ্বংসস্তূপ থেকে মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, তখনই ফুটবল ফিরে এসেছিল মানবতার মুক্তির গান হয়ে। ১৯৩৮ সালের পর দীর্ঘ ১২ বছরের প্রতীক্ষা শেষে ১৯৫০ সালে ব্রাজিলের মাটিতে অনুষ্ঠিত হয় ফিফা বিশ্বকাপের চতুর্থ আসর। এই টুর্নামেন্টটি কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছিল না, বরং যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর বুকে ফুটবলীয় উন্মাদনার এক নতুন মহাকাব্য ছিল।
Table of Contents
প্রেক্ষাপট ও প্রতিকূলতা
১৯৪২ এবং ১৯৪৬ সালের বিশ্বকাপ যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির কারণে বাতিল হয়ে যায়। ফিফার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জুল রিমে ১৯৩০ সালের সেই আদি ট্রফিটি নাৎসিদের হাত থেকে রক্ষা করতে নিজের খাটের নিচে লুকিয়ে রেখেছিলেন। ১৯৫০ সালে যখন ব্রাজিলকে আয়োজক দেশ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়, তখন ফুটবল বিশ্বে ছিল বিশৃঙ্খলা। ভারত, স্কটল্যান্ড, তুরস্ক এবং আর্জেন্টিনার মতো শক্তিশালী দলগুলো বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ কারণে নাম প্রত্যাহার করে নেয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং জার্মানিও ছিল মাঠের বাইরে। শেষ পর্যন্ত মাত্র ১৩টি দল নিয়ে শুরু হয় এই ঐতিহাসিক লড়াই।
মারাকানা: ফুটবলের নতুন মন্দির
বিশ্বকাপকে স্মরণীয় করে রাখতে রিও ডি জেনেইরোতে তৈরি করা হয় তৎকালীন বিশ্বের বৃহত্তম স্টেডিয়াম ‘মারাকানা’। বিশালাকার এই স্থাপনাটি ছিল ব্রাজিলের জাতীয় গর্বের প্রতীক। যদিও টুর্নামেন্ট শুরুর সময় স্টেডিয়ামের নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি, তবুও আড়াই লক্ষ মানুষের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন এই গ্যালারিটি হয়ে উঠেছিল সাম্বার ছন্দে মাতোয়ারা এক ফুটবল তীর্থ।
মাঠের লড়াই ও অঘটন
এই বিশ্বকাপের ফরম্যাট ছিল আধুনিক সময়ের চেয়ে ভিন্ন। কোনো সেমিফাইনাল বা ফাইনাল ম্যাচ ছিল না; বরং সেরা চারটি দল নিয়ে একটি রাউন্ড-রবিন লিগ পদ্ধতির মাধ্যমে চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণের নিয়ম করা হয়। টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় চমক ছিল ইংল্যান্ডের পরাজয়। ফুটবলের জনক হিসেবে খ্যাত ইংল্যান্ড তাদের প্রথম বিশ্বকাপ অভিযানে এসেই খর্বশক্তির যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১-০ গোলে হেরে স্তব্ধ হয়ে যায়।
অন্যদিকে, স্বাগতিক ব্রাজিল ছিল অদম্য। আদেমীর, জিজিনহো এবং জেয়ারের ত্রিভুজ আক্রমণে তারা সুইডেনকে ৭-১ এবং স্পেনকে ৬-১ গোলে বিধ্বস্ত করে শিরোপার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।
১৯৫০ বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্যায়ের পরিসংখ্যান
নিচে টুর্নামেন্টের চূড়ান্ত রাউন্ডের দলগুলোর অবস্থান ও ফলাফলের সংক্ষিপ্ত রূপ দেওয়া হলো:
| দল | ম্যাচ | জয় | ড্র | হার | গোল ব্যবধান | পয়েন্ট |
| উরুগুয়ে | ৩ | ২ | ১ | ০ | +৪ | ৫ |
| ব্রাজিল | ৩ | ২ | ০ | ১ | +১০ | ৪ |
| সুইডেন | ৩ | ১ | ০ | ২ | -৪ | ২ |
| স্পেন | ৩ | ০ | ১ | ২ | -১০ | ১ |
মারাকানাজো: সেই ঐতিহাসিক ১৬ জুলাই
১৬ জুলাই ১৯৫০; মারাকানা স্টেডিয়ামে সমবেত প্রায় ২ লক্ষ দর্শক নিশ্চিত ছিল যে ব্রাজিলই চ্যাম্পিয়ন হতে যাচ্ছে। উরুগুয়ের বিপক্ষে ড্র করলেই শিরোপা নিশ্চিত ছিল স্বাগতিকদের। ম্যাচের ৪৭ মিনিটে ফ্রিয়াকা গোল করে ব্রাজিলকে এগিয়ে নিলে উল্লাসে ফেটে পড়ে পুরো দেশ। কিন্তু গল্পের বাকি অংশটুকু ছিল বিষাদের। ৬৬ মিনিটে শিয়াফিনো গোল করে সমতা ফেরান। ম্যাচের ৭৯ মিনিটে ঘিগিয়ার এক জাদুকরী শট ব্রাজিলের জালে জড়িয়ে গেলে মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো স্টেডিয়াম।
২-১ গোলের সেই পরাজয় ব্রাজিলীয় ফুটবলে ‘মারাকানাজো’ বা ‘মারাকানার কান্না’ হিসেবে পরিচিত। উরুগুয়ে তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা ঘরে তোলে, আর ব্রাজিল ডুবে যায় এক গভীর শোকের সাগরে। এই ম্যাচটি প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, ফুটবলে শেষ বাঁশি বাজার আগে কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়। ধ্বংস আর শোকের বিপরীতে ফুটবল যে জীবনকে নতুন করে উদ্ভাসিত করতে পারে, ১৯৫০-এর এই আসরটি ছিল তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
