বাংলাদেশ ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাসে বিদেশি কোচদের আগমন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ সাফল্যের মুকুটে পালক গুজেছেন, আবার কেউ বিদায় নিয়েছেন চরম ব্যর্থতা আর বিতর্কের বোঝা মাথায় নিয়ে। গত পাঁচ দশকের সেই ধারাবাহিকতায় এবার যুক্ত হলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক অধিনায়ক ও অভিজ্ঞ কোচ টমাস ডুলি। আজ সকালে ৬৫ বছর বয়সী এই জার্মান বংশোদ্ভূত কোচ ঢাকা এসে পৌঁছেছেন। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নিয়োগ নিশ্চিত করেছে এবং সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী রবিবার থেকেই তিনি জাতীয় দলের দায়িত্ব বুঝে নেবেন।
Table of Contents
বিদেশি কোচের পরিক্রমা ও সোনালি অতীত
বাংলাদেশে বিদেশি কোচের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭৮ সালে পশ্চিম জার্মানির ওয়ার্নার বেকেল হপ্টের হাত ধরে। তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে শুরুর দিকের কোচরা বিশেষ কোনো ছাপ রাখতে পারেননি। নব্বইয়ের দশকে এসে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। ১৯৯৫ সালে জার্মান কোচ অটো ফিস্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশের ফুটবলে পেশাদারিত্বের ছোঁয়া লাগে। তাঁর অধীনেই মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত চার জাতির টাইগার ট্রফিতে বাংলাদেশ প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা জেতে।
এরপর ১৯৯৯ সালে ইরাকি কোচ সামির শাকেরের অধীনে দক্ষিণ এশিয়ান (এসএ) গেমসে ঐতিহাসিক স্বর্ণপদক জয় করে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। তবে সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ ঘটে ২০০৩ সালে অস্ট্রিয়ান কোচ জর্জ কোটানের সময়ে। তাঁর অধীনে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপা জেতে, যা আজও দেশের ফুটবল ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ অর্জন হিসেবে বিবেচিত।
উল্লেখযোগ্য বিদেশি কোচ ও তাঁদের অর্জন
বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে বেশ কয়েকজন বিদেশি কোচ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। নিচে তাঁদের অর্জনের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| কোচের নাম | দেশ | উল্লেখযোগ্য অর্জন/সাফল্য |
| ওয়ার্নার বেকেল হপ্ট | পশ্চিম জার্মানি | বাংলাদেশের প্রথম বিদেশি কোচ (১৯৭৮)। |
| অটো ফিস্টার | জার্মানি | ১৯৯৫ সালে মিয়ানমারে টাইগার ট্রফি জয়। |
| সামির শাকের | ইরাক | ১৯৯৯ এসএ গেমসে স্বর্ণপদক জয়। |
| জর্জ কোটান | অস্ট্রিয়া | ২০০৩ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপা জয়। |
| জোরান জর্জেভিচ | সার্বিয়া | ২০১০ এসএ গেমসে স্বর্ণপদক জয়। |
| জেমি ডে | ইংল্যান্ড | ২০১৮ এশিয়ান গেমসের নকআউট পর্বে উত্তরণ। |
| হাভিয়ের কাবরেরা | স্পেন | ৫২ মাস দায়িত্ব পালন (দীর্ঘতম সময়)। |
আধুনিক যুগের বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জেমি ডে এবং হাভিয়ের কাবরেরার মতো কোচরা দীর্ঘ সময় কাজ করলেও বড় কোনো ট্রফি জেতা সম্ভব হয়নি। জেমি ডের অধীনে এশিয়ান গেমসে কাতারকে হারিয়ে নকআউট পর্বে ওঠা ছিল একটি বড় চমক। অন্যদিকে, কাবরেরার সময়ে জাতীয় দলে প্রবাসী ফুটবলারদের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে শক্তির গভীরতা বাড়ানো হলেও মাঠের ফলাফল প্রত্যাশা অনুযায়ী আসেনি। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, ঘরোয়া লিগের মান এবং সঠিক পরিকল্পনার অভাব বারবার বিদেশি কোচদের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
টমাস ডুলি: এক বর্ণাঢ্য প্রোফাইল
নতুন কোচ টমাস ডুলির খেলোয়াড়ি ও কোচিং ক্যারিয়ার অত্যন্ত সমৃদ্ধ, যা দেশের ফুটবলে নতুন আশার সঞ্চার করেছে:
খেলোয়াড়ি জীবন: যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে ৮১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ এবং ১৯৯৮ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ক্লাব ফুটবলে বায়ার লেভারকুসেন ও শালকের মতো ক্লাবে খেলেছেন। শালকের হয়ে উয়েফা কাপ ও কাইজারস্লাউটার্নের হয়ে বুন্দেসলিগা জেতার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
কোচিং ক্যারিয়ার: ফিলিপাইন জাতীয় দলকে প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপে তোলার কৃতিত্ব ডুলির। এছাড়া ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যানের সহকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলে কাজ করেছেন এবং গায়ানা জাতীয় দলের প্রধান কোচ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
ডুলির সামনে কঠিন পথ
টমাস ডুলির অভিজ্ঞতা আকাশচুম্বী হলেও বাংলাদেশের ফুটবল বাস্তবতায় টিকে থাকা তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। একজন আন্তর্জাতিক মানের স্ট্রাইকারের অভাব এবং লিগের মানোন্নয়ন ছাড়া শুধু কৌশল দিয়ে কতটুকু উন্নতি সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়। অটো ফিস্টার বা জর্জ কোটানরা যেভাবে প্রতিকূল পরিবেশেও দল গুছিয়ে সাফল্য এনেছিলেন, ডুলি কি পারবেন সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করতে?
সাফল্য আর ব্যর্থতার দোলাচলে দোদুল্যমান বাংলাদেশের ফুটবলে ডুলির এই যাত্রা কেবল একটি নতুন নিয়োগ নয়, বরং মৃতপ্রায় ফুটবলকে পুনরুজ্জীবিত করার এক নতুন পরীক্ষা। রোববার থেকে শুরু হতে যাওয়া জাতীয় দলের ক্যাম্পই বলে দেবে ডুলির জমানায় বাংলাদেশের ফুটবল কোন পথে এগোবে।
আপনার কি মনে হয় টমাস ডুলি তাঁর আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের গোলখরা এবং রক্ষণভাগের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করতে পারবেন?
