বড় বোনের পিছে পিছে বের হওয়াই কাল হলো রামিসার

রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছর বয়সী দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে পাশবিক নির্যাতন ও শ্বাসরোধ করে হত্যার ঘটনায় এলাকায় গভীর শোক ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ এবং ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সকাল আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে মিরপুরের পল্লবী এলাকার মিল্লাত ক্যাম্প সংলগ্ন একটি বহুতল ভবনে এই নৃশংস ঘটনা ঘটে। নিহত রামিসা তার বাবা, মা এবং নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া বড় বোন রাইসা আক্তারের সঙ্গে ওই ভবনের একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকত। ঘটনার দিন বড় বোনের পিছু নিয়ে ঘর থেকে বের হওয়াই শিশুটির জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনে।

ঘটনার সূত্রপাত ও নিখোঁজ রহস্য

পারিবারিক ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসার বড় বোন রাইসা আক্তার তাদের বাসার অদূরে অবস্থিত চাচার বাসায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়। সে সময় ছোট বোন রামিসাও তার সঙ্গে যাওয়ার জন্য বায়না ধরে এবং পেছনে পেছনে বের হতে চায়। রাইসা তাকে ঘরে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে একপর্যায়ে রামিসাকে ঘরের ভেতরে রেখে দরজা আটকে দিয়ে গোপনে বেরিয়ে যায়। তবে রামিসা বিষয়টি বুঝতে পেরে বড় বোনের পিছু নেওয়ার উদ্দেশ্যে নিজে ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে।

ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের ফ্ল্যাটের ঠিক সামনের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা (৩০) দরজার বাইরে অবস্থান করছিলেন। তিনি রামিসাকে একা পেয়ে জোরপূর্বক টেনে হিঁচড়ে নিজের ফ্ল্যাটের ভেতরে নিয়ে যান। রাইসা যখন চাচার বাসায় পৌঁছায়, তখনো সে জানত না যে তার ছোট বোন তার পেছনে এসে নিখোঁজ হয়েছে। কিছু সময় পর রাইসা চাচার বাসা থেকে নিজ ফ্ল্যাটে ফিরে আসলে পরিবারের সদস্যরা লক্ষ্য করেন যে রামিসা ঘরে নেই। তখন তারা বুঝতে পারেন রামিসা চাচার বাসায় যায়নি এবং নিখোঁজ হয়েছে।

পরিবারের অনুসন্ধান ও আসামিদের আচরণ

রামিসাকে খুঁজে না পেয়ে তার মা পারভিন আক্তার ও পরিবারের অন্য সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে ওই ভবনের বিভিন্ন তলায় তল্লাশি শুরু করেন। তারা ভবনের প্রতিটি ফ্ল্যাটের দরজায় কড়া নাড়েন এবং ভেতরে রামিসার উপস্থিতি সম্পর্কে জানতে চান। ভবনের অন্য সব ভাড়াটিয়ারা দরজা খুলে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করলেও, সামনের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার (২৬) দীর্ঘক্ষণ তাদের ফ্ল্যাটের দরজা খোলেননি। পরিবারের সদস্যরা বারবার দরজা ধাক্কালেও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ দেওয়া হয়নি, যা পরবর্তীতে তাদের ওপর সন্দেহের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবারের বক্তব্য

ঘটনার বিষয়ে নিহত রামিসার বড় বোন রাইসা আক্তার গণমাধ্যমকে জানায়, সে যখন চাচার বাসায় যাচ্ছিল, তখন রামিসা তার সঙ্গে বের হতে চেয়েছিল। সে রামিসাকে ঘরে ফিরে যেতে বলে দ্রুত বের হয়ে যায়। রামিসা যে তার অলক্ষ্যে পেছনে পেছনে দরজার বাইরে চলে এসেছিল, তা সে টের পায়নি। রাইসার ভাষ্যমতে, ঠিক তখনই দরজার বাইরে ওত পেতে থাকা সোহেল রানা রামিসাকে টেনে তার ঘরে নিয়ে যান। টেনে নেওয়ার সময় রামিসা চিৎকার করেছিল এবং সেই চিৎকারের শব্দ ঘর থেকে তাদের মা শুনতে পেয়েছিলেন।

রামিসার মা পারভিন আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, “আমার মেয়েটি যখন চিৎকার দিচ্ছিল, তখন আমি বুঝতে পারিনি যে ওটা রামিসার কণ্ঠ ছিল। আমি ভেবেছিলাম ও বড় বোনের সঙ্গেই চলে গেছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর যখন বড় মেয়ে একা ফিরে আসে, তখনই আমার বুকটা কেঁপে ওঠে। আমি তাৎক্ষণিক খোঁজ শুরু করি এবং সামনের ফ্ল্যাটের দরজা ধাক্কাই। ভবনের সব ফ্ল্যাটের দরজা খুললেও সোহেল ও তার স্ত্রী দরজা খোলেনি।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, কয়েক মাস আগে ওই ফ্ল্যাটে ভাড়া আসা সোহেল রানার পরিবারের সঙ্গে তাদের পূর্ব কোনো শত্রুতা বা পরিচয় ছিল না, এমনকি কখনো একটি কথাও হয়নি।

পুলিশের তদন্ত ও আইনগত পদক্ষেপ

ঘটনার পর পুলিশে খবর দেওয়া হলে পল্লবী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং সন্দেহভাজন ফ্ল্যাটের দরজা খুলে তল্লাশি চালায়। পুলিশ সেখান থেকে শিশু রামিসার মরদেহ উদ্ধার করে এবং প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, শিশু রামিসাকে জোরপূর্বক ঘরে তুলে নিয়ে প্রথমে পাশবিক নির্যাতন ও ধর্ষণ করা হয়। পরবর্তীতে এই অপরাধের প্রমাণ ও আলামত লোপাট করার উদ্দেশ্যে শিশুটিকে শ্বাসরোধ করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পুলিশ এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।

স্থানীয়দের ক্ষোভ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি

বুধবার (২০ মে) সকালে পল্লবীর মিল্লাত ক্যাম্প সংলগ্ন ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পুরো ভবন এবং আশেপাশের এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ভবনটির প্রধান প্রবেশদ্বারে একটি বিশাল ব্যানার ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেখানে রামিসার হত্যাকারীদের জনসম্মুখে এনে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফাঁসি কার্যকর করার দাবি জানানো হয়েছে। ভবনের নিচে এবং আশেপাশের রাস্তায় শত শত স্থানীয় বাসিন্দা ও ক্ষুব্ধ জনতা ভিড় জমিয়েছেন। তারা এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, একটি সাত বছরের অবুঝ শিশুকে যেভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে, তার বিচার দৃষ্টান্তমূলক হতে হবে যেন ভবিষ্যতে আর কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়। স্থানীয়রা মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন