ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে নিহত দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মরদেহ আনুষ্ঠানিকভাবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। শনিবার (৯ মে) বিকেলে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে অনুষ্ঠিত এক পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে এই মরদেহ হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
Table of Contents
পতাকা বৈঠক ও মরদেহ হস্তান্তর
শনিবার বিকেল সাড়ে ৬টার দিকে কসবা উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের কুইয়াপানিয়া গ্রামের ২০৩৭ নম্বর সীমান্ত পিলারের কাছে এই পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন বিজিবির সুলতানপুর ৬০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস.এম. শরিফুল ইসলাম। তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন কসবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজনীন সুলতানা এবং পরিদর্শক (তদন্ত) রিপন কুমার দাস। অন্যদিকে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পক্ষে নেতৃত্ব দেন বিএসএফের ৪৯ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল অজিত কুমার।
বৈঠক শেষে বিজিবি কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস.এম. শরিফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান যে, বিএসএফের গুলিতে নিহত দুই বাংলাদেশির মরদেহ যাবতীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে বিজিবির মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে মরদেহগুলো স্থানীয় থানা পুলিশের উপস্থিতিতে স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
নিহতদের পরিচয়
বিএসএফের গুলিতে নিহত ব্যক্তিরা হলেন কসবা উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের ধজনগর গ্রামের হেবজু মিয়ার ছেলে মো. মুরসালিন (২০) এবং একই ইউনিয়নের মধুপুর গ্রামের মকরম আলীর ছেলে নবীর হোসেন (৫৫)। তাঁরা উভয়েই সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দা ছিলেন।
ঘটনার বিবরণ ও বিজিবির ভাষ্য
বিজিবি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সুলতানপুর ৬০ ব্যাটালিয়ন থেকে শনিবার সকালে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ঘটনার বিস্তারিত জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (৮ মে) রাত আনুমানিক ১১টার দিকে কসবা উপজেলার প্রায় ১৫ জন বাংলাদেশি নাগরিক ভারতীয় চোরাকারবারিদের সহায়তায় সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। তাঁরা ভারতের প্রায় ২০০ গজ ভেতরে ধজনগর-পাথারিয়াদ্বার এলাকায় অবস্থান করছিলেন।
বিজিবি জানায়, চোরাচালানের মালামাল নিয়ে বাংলাদেশে ফেরার সময় বিএসএফের ৪৯ ব্যাটালিয়নের পাথারিয়াদ্বার ক্যাম্পের একটি টহল দল তাঁদের গতিরোধ করে। এ সময় বিএসএফের দাবি অনুযায়ী, বাংলাদেশি নাগরিকরা বিএসএফ সদস্যদের ওপর চড়াও হন এবং একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বিএসএফ সদস্যরা আত্মরক্ষার্থে বা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে চোরাকারবারিদের লক্ষ্য করে ছররা গুলি ছোড়েন।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু
বিএসএফের ছোড়া ছররা গুলিতে মো. মুরসালিন ও নবীর হোসেন গুরুতর আহত হন। বিএসএফ সদস্যরা তাঁদের উদ্ধার করে ভারতের একটি স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গভীর রাতে তাঁদের মৃত্যু হয়। বিএসএফের পক্ষ থেকে শনিবার সকালে বিজিবিকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিজিবি আরও জানায় যে, চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবি সবসময় জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে এবং এ ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু রোধে সীমান্তে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।
সীমান্তে বর্তমান পরিস্থিতি
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কসবা সীমান্ত এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পতাকা বৈঠক চলাকালীন ও মরদেহ হস্তান্তরের সময় সীমান্তে সাধারণ মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। বিজিবির পক্ষ থেকে সীমান্তে উত্তেজনা নিরসনে এবং ভবিষ্যতে এ ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত গোলাগুলি রোধে বিএসএফকে সতর্ক করা হয়েছে। স্থানীয় পুলিশ মরদেহগুলো বুঝে নেওয়ার পর ময়নাতদন্ত ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে। কসবা থানার পুলিশ জানায়, এই ঘটনায় প্রয়োজনীয় অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে। বর্তমানে সীমান্ত পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে।
বিজিবি সূত্র আরও জানায়, সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক মারণাস্ত্র ব্যবহার না করার জন্য দুই দেশের উচ্চপর্যায়ে যে সমঝোতা রয়েছে, তা কঠোরভাবে পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের পর সীমান্ত নিরাপত্তা এবং দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে পতাকা বৈঠকে বিজিবি তাদের উদ্বেগের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় শোক ও বিচার দাবি করা হয়েছে। বিজিবি পুনরায় সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপার না করার জন্য সতর্কবার্তা জারি করেছে।
