কুয়েতে কারাভোগ শেষে দেশে ফেরার পর ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ফেনীর পরশুরাম উপজেলার এক প্রবাসীর মৃত্যুতে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে পরিবার ও এলাকায়। নিহত ব্যক্তির নাম নুর ইসলাম সাগর (৩৮)। দীর্ঘ প্রবাস জীবনের অনিশ্চয়তা, কারাভোগ এবং দেশে ফেরার পরপরই মৃত্যুর ঘটনায় পুরো পরিবারে চলছে শোক ও হতাশা।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, রোববার (১৯ এপ্রিল) দুপুরে তার মরদেহ নিজ গ্রাম দক্ষিণ শালধর পৌঁছালে স্বজনদের আহাজারিতে পুরো এলাকা ভারী হয়ে ওঠে। পরে জানাজা শেষে স্থানীয় কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। জানাজায় শত শত মানুষ অংশ নেন, যেখানে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন।
নুর ইসলাম সাগর ফেনীর পরশুরাম উপজেলার চিথলিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ শালধর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডা. মো. শাহজাহানের বড় ছেলে। জীবিকার তাগিদে তিনি ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে কুয়েতে যান। তবে সেখানে গিয়ে প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র না থাকায় তিনি অনিশ্চিত অবস্থায় পড়ে যান এবং নিয়মিত কাজকর্মে বাধার মুখে পড়েন।
পারিবারিক তথ্য অনুযায়ী, গত ২ এপ্রিল কুয়েতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে আটক করে। এরপর তিনি প্রায় ১৫ দিন কারাভোগ করেন। কারামুক্তির পর ১৮ এপ্রিল একটি ফ্লাইটে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।
দেশে ফেরার পরই ঘটে মর্মান্তিক ঘটনা। বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। উপস্থিত কর্তৃপক্ষ দ্রুত তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে।
নিহতের ছোট ভাই ইকবাল হোসেন বলেন, বিদেশে যাওয়ার পর থেকেই সাগর মানসিক চাপে ছিলেন। কাজ না পাওয়া, অবৈধ অবস্থায় থাকা এবং হঠাৎ আটক হওয়ার ঘটনাগুলো তাকে ভীষণভাবে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল। তিনি বলেন, “আমরা কখনো ভাবিনি ভাই এভাবে ফিরে আসবে। বিমানবন্দরে তার মৃত্যুর খবর শুনে পুরো পরিবার স্তব্ধ হয়ে গেছে।”
প্রবাস জীবনের সংক্ষিপ্ত চিত্র
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| নাম | নুর ইসলাম সাগর |
| বয়স | ৩৮ বছর |
| পিতা | ডা. মো. শাহজাহান |
| এলাকা | দক্ষিণ শালধর, চিথলিয়া, পরশুরাম, ফেনী |
| বিদেশ গমন | আগস্ট ২০২৫, কুয়েত |
| আটক | ২ এপ্রিল (কুয়েত কর্তৃপক্ষ) |
| কারাভোগ | প্রায় ১৫ দিন |
| দেশে ফেরত | ১৮ এপ্রিল |
| মৃত্যুর স্থান | হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর |
| প্রাথমিক কারণ | হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ |
রোববার বিকেল ৫টার দিকে শালধর বাজার কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিসহ শত শত মানুষ অংশ নেন। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
পরশুরাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আশ্রাফুল ইসলাম জানান, বিমানবন্দরে মৃত্যুর বিষয়টি পুলিশ পরিবারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়। পরে পরিবার মরদেহ গ্রহণ করে এলাকায় নিয়ে এসে ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী দাফন সম্পন্ন করে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের মধ্যে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ এবং কারাভোগজনিত ট্রমা শারীরিক জটিলতা তৈরি করতে পারে। অনেক সময় দেশে ফেরার আগমুহূর্তে বা ফেরার পর এমন আকস্মিক স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দেয়। এ কারণে প্রবাসীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আরও গুরুত্ব পাচ্ছে।
নুর ইসলাম সাগরের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং প্রবাস জীবনের বাস্তবতা, অনিশ্চয়তা ও মানবিক সংকটের একটি করুণ প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে, যা তার পরিবার ও এলাকাবাসীকে গভীরভাবে শোকাহত করেছে।
