লন্ডনের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে আবারও এক স্মরণীয় সন্ধ্যার জন্ম দিল প্রবাসী বাংলাদেশিদের বহুল প্রত্যাশিত আয়োজন ‘বাউল উৎসব লন্ডন ২০২৬’। বাংলা ক্রেজ ইউকের উদ্যোগে আয়োজিত এই উৎসব শুধু একটি সংগীতানুষ্ঠান নয়, বরং প্রবাসে বসবাসরত বাঙালিদের জন্য শিকড়ের সঙ্গে পুনঃসংযোগের এক আবেগঘন উপলক্ষ হয়ে ওঠে। লন্ডনের অভিজাত কলোসিয়াম স্যুটে অনুষ্ঠিত এ আয়োজন প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে রূপ নেয় এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়।
অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ ছিলেন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী শারমিন দিপু। তাঁর দরদি ও সংবেদনশীল কণ্ঠে পরিবেশিত বাউল গান দর্শক-শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি শুধু গানই গাইছিলেন না, বরং বাউল দর্শনের অন্তর্নিহিত মানবিকতা, আত্মঅনুসন্ধান ও প্রেমের দর্শনকে শ্রোতাদের সামনে জীবন্ত করে তুলছিলেন। লন্ডনের মতো বহুজাতিক শহরে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের উপস্থিতিতে বাউল গান পরিবেশন যেন এই ধারার বিশ্বজনীন আবেদনকে আরও একবার দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করে।
শারমিন দিপুর পাশাপাশি উৎসবে অংশ নেন দেশ ও প্রবাসের একাধিক খ্যাতিমান বাউল ও লোকসংগীতশিল্পী। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সাগর বাউল, বেলী আফরোজ, বাউল এম হোসেন, সাজ্জাদ নূর, বন্যা তালুকদার, বাউল ইকরাম উদ্দিন ও রানা। এ ছাড়া মঞ্চে সুযোগ পান কয়েকজন প্রতিভাবান প্রবাসী বাংলাদেশি শিল্পীও। সম্মিলিত পরিবেশনায় বাউল গানের আধ্যাত্মিক দর্শন, সাম্যের বাণী ও মানবিক মূল্যবোধ নতুন মাত্রায় প্রকাশ পায়।
টিকিটভিত্তিক আয়োজন হলেও দর্শকদের উপস্থিতি ও উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রবাসী বাংলাদেশিরা পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে এই উৎসবে অংশ নেন, যা অনুষ্ঠানস্থলকে পরিণত করে এক উৎসবমুখর পরিবেশে। বাংলা ক্রেজ ইউকের সিইও ফয়সাল আহমেদ বলেন, লন্ডনের বুকে বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতিকে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। তাঁর মতে, এমন আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে বাউল গান ও এর দর্শন পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে শারমিন দিপু বলেন, বিদেশের মাটিতে বাউল গান পরিবেশন করা তাঁর জন্য গর্বের পাশাপাশি গভীর আবেগের বিষয়। তাঁর ভাষায়, বাউল গান কেবল সংগীত নয়, এটি মানুষের ভেতরের সত্য ও ভালোবাসার অনুসন্ধান। ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ যখন মনোযোগ দিয়ে এই গান শোনেন, তখন বোঝা যায়—সংস্কৃতির কোনো সীমানা নেই।
অনুষ্ঠানে যন্ত্রসংগীতে অংশ নেন লন্ডনে বসবাসরত বাঙালি সংগীতশিল্পীরা। তানিম, হাসান, রিজান ও সম্রাট তাঁদের দক্ষতায় একতারা ও দোতারার সঙ্গে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের মেলবন্ধন ঘটিয়ে গানগুলোকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলেন।
উল্লেখযোগ্য যে, শারমিন দিপু বর্তমানে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্য—উভয় দেশেই সমানভাবে জনপ্রিয়। প্লেব্যাক, আধুনিক গান, নজরুলসংগীত ও লোকগানে তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য থাকলেও বাউল ধারায় তাঁর গ্রহণযোগ্যতা সবচেয়ে বেশি। সংগীতচর্চার পাশাপাশি লন্ডনে আইন পেশার সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি তাঁর বহুমাত্রিক প্রতিভার পরিচয় দিচ্ছেন।
বাউল উৎসব লন্ডন ২০২৬: সংক্ষিপ্ত তথ্য
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| আয়োজনের নাম | বাউল উৎসব লন্ডন ২০২৬ |
| স্থান | কলোসিয়াম স্যুট, লন্ডন |
| আয়োজক | বাংলা ক্রেজ ইউকে |
| প্রধান শিল্পী | শারমিন দিপু |
| অন্যান্য শিল্পী | সাগর বাউল, বেলী আফরোজ, বাউল এম হোসেনসহ আরও অনেকে |
| দর্শক | প্রবাসী বাংলাদেশি ও সংস্কৃতিপ্রেমী শ্রোতা |
এই আয়োজন আবারও প্রমাণ করেছে—বাউল গান কেবল গ্রামবাংলার ঐতিহ্য নয়, এটি এক বিশ্বজনীন সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, যা দেশের সীমানা পেরিয়ে প্রবাসেও মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে স্থান করে নিতে সক্ষম।
