খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ই জুলাই ২০২৬, ১২:২৭ এএম

ইউক্রেনের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের নাটকীয় রদবদল ঘটেছে। মাত্র এক বছর দায়িত্ব পালনের পর পদত্যাগ করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া স্ভিরিডেনকো। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সরাসরি অনুরোধে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানা গেছে। গতকাল মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) ইউক্রেনের পার্লামেন্ট (ভেরখোভনা রাদা) আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর এই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছে।
তবে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে এমন আকস্মিক ও বড় পরিবর্তনের পেছনে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ বা স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি। তিনি কেবল উল্লেখ করেছেন যে, দেশের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক কৌশলে বড় পরিবর্তন আসছে এবং এই পরিবর্তনের স্বার্থেই নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন। হঠাৎ নেওয়া এই সিদ্ধান্তে পার্লামেন্টের বেশ কয়েকজন আইনপ্রণেতা অবশ্য উষ্মা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বিদায়ী ভাষণে ৪০ বছর বয়সি অর্থনীতিবিদ স্ভিরিডেনকো বলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের হাল ধরার পর বিগত বছরের প্রতিটি দিনই ছিল কঠিন সিদ্ধান্ত এবং নিষ্পত্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার পালা। নিজের দায়িত্বকালকে অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল আখ্যা দিয়ে তিনি তাঁর ওপর আস্থা রাখার জন্য সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। স্ভিরিডেনকো উল্লেখ করেন, তিনি সবসময় কথার চেয়ে কাজের ফলাফলের ওপর বেশি বিশ্বাস রেখে পথ চলেছেন।
উল্লেখ্য, স্ভিরিডেনকো যখন এক বছর আগে ক্যাবিনেটের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তার মাত্র কয়েক মাস আগেই ইউক্রেনের বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে জড়িয়ে একটি বড় ধরনের দুর্নীতি কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়েছিল। ওই ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়তে যথেষ্ট কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগে স্ভিরিডেনকোকে সমালোচকদের তোপের মুখে পড়তে হয়।
অভ্যন্তরীণ সমালোচনার মুখোমুখি হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্ভিরিডেনকোর বেশ সুনাম ছিল। বিশেষ করে মার্কিন কর্মকর্তাদের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক ছিল চোখে পড়ার মতো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে জেলেনস্কির দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের টানাপোড়েনের পর ওয়াশিংটনের সাথে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ বিনিয়োগ চুক্তি সম্পন্ন করতে স্ভিরিডেনকো অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন।
এদিকে বিদায়ী সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে তীব্র কটাক্ষ করেছেন বিরোধী দল ‘হোলোস’ পার্টির আইনপ্রণেতা ইয়ারোস্লাভ ঝেলেজনিয়াক। তিনি বলেন, এই সরকার প্রতিদিন নতুন ফলাফলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং তারা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে—প্রতিদিন নতুন নতুন উপস্থাপনা, গালভরা সংবাদ সম্মেলন এবং প্রতিদিন দুর্নীতির মামলায় একজন করে নতুন সন্দেহভাজনকে জাতির সামনে হাজির করা ছাড়া তারা তেমন কিছুই করতে পারেনি।
ইউক্রেনের সংবিধান অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর এই বিদায়ের ফলে স্বাভাবিকভাবেই বর্তমান সরকারের পতন ঘটেছে। এখন নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কার ওপর দায়িত্ব পড়বে, তা নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে। পার্লামেন্ট সদস্যদের একটি বড় অংশ রাষ্ট্রীয় তেল-গ্যাস কোম্পানি ‘নাফতোগাজ’-এর প্রধান সের্হি কোরেতস্কিকে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সবচেয়ে যোগ্য দাবিদার মনে করছেন। পাশাপাশি সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বর্তমান জ্বালানি মন্ত্রী ও স্ভিরিডেনকোর পূর্বসূরি ডেনিস শমিহাল কিংবা প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরোভের নামও আলোচনায় রয়েছে।
চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ইউক্রেন যখন রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো ও সামরিক লজিস্টিকস লক্ষ্য করে দূরপাল্লার হামলা জোরদার করছে, ঠিক তখনই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এমন বড় ধরনের পরিবর্তন এলো। ইউক্রেনে প্রধানমন্ত্রীর প্রধান কাজই হলো যুদ্ধকালীন নড়বড়ে অর্থনীতিকে সচল রাখা এবং রাশিয়ার ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বেসামরিক অবকাঠামো দ্রুত মেরামত করা।
পদত্যাগের ঠিক আগমুহূর্তে স্ভিরিডেনকো নতুন সরকারের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা দিয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন, নতুন প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে আসন্ন শীত মৌসুমের প্রস্তুতি নেওয়া। কারণ, শীতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎ গ্রিড ও গ্যাস সংযোগের ওপর হামলা আরও মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।
মন্তব্য